বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিহাসে পরমাণু শক্তির উদ্ভাবন মানব সভ্যতার সামনে এক যুগপৎ সম্ভাবনা ও সংকটের দ্বার উন্মোচন করেছে। একদিকে এই শক্তি যেমন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং কৃষিক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, অন্যদিকে তেমনই মারণাস্ত্রের প্রতিযোগিতায় বিশ্ব রাজনীতিকে ঠেলে দিয়েছে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে। ভারতে পরমাণু গবেষণার ঐতিহাসিক বিকাশ এবং এর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমীকরণ অনুধাবন করতে হলে প্রথমেই পরমাণু শক্তির মৌলিক বৈজ্ঞানিক ভিত্তি এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বৈশ্বিক রাজনীতির প্রারম্ভিক প্রেক্ষাপটটি বিশ্লেষণ করা অপরিহার্য।
১.১ পরমাণু শক্তির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি: বিভাজন (Fission) ও সংযোজন (Fusion)
পদার্থের ক্ষুদ্রতম একক পরমাণুর কেন্দ্রে বা নিউক্লিয়াসে প্রোটন এবং নিউট্রন কণাগুলো প্রবল সবল নিউক্লীয় বলের (Strong Nuclear Force) মাধ্যমে আবদ্ধ থাকে। সাধারণ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় কেবল পরমাণুর বাইরের কক্ষপথের ইলেকট্রনের আদান-প্রদান ঘটে, কিন্তু নিউক্লীয় বিক্রিয়ায় সরাসরি পরমাণুর কেন্দ্রস্থলের পরিবর্তন ঘটে। প্রচলিত কাঠ বা কয়লা পোড়ানোর মতো রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় যে তাপশক্তি পাওয়া যায়, পারমাণবিক প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন শক্তির পরিমাণ তার তুলনায় বহুগুণ বেশি। মূলত দুটি প্রধান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরমাণুর কেন্দ্র থেকে এই বিপুল শক্তি নির্গত হয়—পরমাণু বিভাজন বা ফিশন (Nuclear Fission) এবং পরমাণু সংযোজন বা ফিউশন (Nuclear Fusion)।
প্রথম পদ্ধতি অর্থাৎ পরমাণু বিভাজন বা ফিশন প্রক্রিয়ায় কোনো ভারী মৌলিক পদার্থের নিউক্লিয়াসকে আঘাত করে বিভাজিত করা হয় এবং সেখান থেকে নিউট্রন ও প্রোটন কণার পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে প্রচণ্ড শক্তি নির্গত হয়। আধুনিক নিউক্লীয় পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায়, ইউরেনিয়াম-২৩৫ (92U235), প্লুটোনিয়াম-২৩৯ (94Pu239) বা ইউরেনিয়াম-২৩৩ (92U233)-এর মতো ভারী ও অস্থিতিশীল নিউক্লিয়াসকে যখন ধীরগতির তাপীয় নিউট্রন (Thermal Neutron) দিয়ে আঘাত করা হয়, তখন সেটি ভেঙে দুটি তুলনামূলকভাবে হালকা নিউক্লিয়াসে পরিণত হয় এবং তার সাথে অতিরিক্ত দু-তিনটি মুক্ত নিউট্রন ও বিপুল পরিমাণ গতিশক্তি ও গামা রশ্মি নির্গত হয়। ইউরেনিয়াম-২৩৫ নিউক্লিয়াসের একটি আদর্শ বিভাজন বিক্রিয়াকে নিচের সমীকরণের মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়:
92U235 +0n1---> 56Ba141+36Kr92+30n1+Q(শক্তি)
এই প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন অতিরিক্ত নিউট্রনগুলো পুনরায় পার্শ্ববর্তী ইউরেনিয়াম নিউক্লিয়াসকে আঘাত করে এবং একটি শৃঙ্খল বিক্রিয়া (Chain Reaction) শুরু হয়। এই শৃঙ্খল বিক্রিয়াকে যখন পারমাণবিক চুল্লি বা রিঅ্যাক্টরের (Nuclear Reactor) ভেতরে নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় পরিচালনা করা হয়, তখন তা থেকে প্রাপ্ত তাপশক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাষ্পীয় টারবাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। অন্যদিকে, এই শৃঙ্খল বিক্রিয়া যখন অনিয়ন্ত্রিতভাবে মুহূর্তের মধ্যে সংঘটিত হয়, তখন তা পারমাণবিক বোমার মতো প্রলয়ংকরী বিস্ফোরণ ঘটায়।
দ্বিতীয় পদ্ধতিটি হলো পরমাণু সংযোজন বা ফিউশন (Nuclear Fusion), যেখানে একাধিক হালকা মৌলিক পদার্থের নিউক্লিয়াসের মধ্যে প্রোটন বা নিউট্রন যুক্ত হয়ে একটি অপেক্ষাকৃত ভারী নিউক্লিয়াস গঠন করে এবং সেই সংযোজন প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়। যেমন—উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপে হাইড্রোজেনের দুটি আইসোটোপ ডিউটেরিয়াম (1H2) এবং ট্রিটিয়াম (1H3) সংযোজিত হয়ে হিলিয়াম (2He4) নিউক্লিয়াস, একটি মুক্ত নিউট্রন এবং বিপুল শক্তি উৎপাদন করে:
1H2 + 1H3 ---> 2He4 + 0n1 + 17.6 MeV
উভয় প্রক্রিয়াতেই শক্তি নির্গমনের মূল উৎস হলো আলবার্ট আইনস্টাইনের ভর-শক্তি সমতুল্যতা সূত্র। বিক্রিয়ার পূর্ববর্তী মোট ভর এবং বিক্রিয়ার পরবর্তী মোট ভরের মধ্যে যে সূক্ষ্ম পার্থক্য বা ভরত্রুটি দেখা যায়, সেটিই আলোর বেগের (c) বর্গের গুণফলের সমান শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। এই দুই পদ্ধতি মারফত যে পরিমাণ তাপ সৃষ্টি হয়, তা কয়লা পুড়িয়ে বা অন্য কোনো প্রচলিত জ্বালানি উৎস থেকে পাওয়া কার্যত অসম্ভব। একটি সুনির্দিষ্ট তুলনামূলক পরিসংখ্যান দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়: পরমাণু বিভাজনের প্রক্রিয়ায় মাত্র এক পাউন্ডের হাজার ভাগের এক ভাগ পদার্থ থেকে যে পরিমাণ শক্তি উৎপাদিত হয়, প্রচলিত পদ্ধতিতে সমপরিমাণ শক্তি পেতে হলে প্রায় পনেরশো (১,৫০০) টন কয়লা পোড়াতে হয়।
তবে শান্তিপূর্ণ কাজে এই অমিত পারমাণবিক উৎসের ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, জটিল তাত্ত্বিক ও কারিগরি বিষয়বস্তুর ওপর গভীর দক্ষতা এবং নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। প্রকৃতি থেকে সংগৃহীত আকরিক থেকে বিশেষ রাসায়নিক ও প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়ায় ইউরেনিয়াম, প্লুটোনিয়াম এবং থোরিয়াম জ্বালানি প্রস্তুত ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের নানাবিধ জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়। এছাড়াও ভারী জলের চুল্লি (Heavy Water Reactor), হালকা জলের চুল্লি (Light Water Reactor), ফাস্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টর (Fast Breeder Reactor) কিংবা গবেষণাকর্মে সহায়তার জন্য নির্মিত চুল্লিগুলোর পরিচালনা ও মেরামতি অত্যন্ত ঝুঁকিসাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল।
১.২ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং হিরোশিমা ও নাগাসাকির মানবিক বিপর্যয়
তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণাগার থেকে পরমাণু শক্তির প্রথম বাস্তব ও দৃশ্যমান আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল সৃষ্টিশীল কোনো কাজে নয়, বরং মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন মিত্রশক্তির অন্যতম প্রধান শরিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গোপনে পরমাণু বোমা নির্মাণের প্রকল্প পরিচালনা করে। ১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই ভোর সাড়ে পাঁচটায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোর মরুভূমিতে মানব ইতিহাসের প্রথম পরীক্ষামূলক আণবিক বিস্ফোরণটি ঘটানো হয়। এই সফল পরীক্ষার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই মার্কিন প্রশাসন বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে এই মারণাস্ত্র প্রয়োগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট দিনটি বিশ্ব মানব ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ওই দিন জাপানের জনবহুল শহর হিরোশিমায় প্রথম পরমাণু বোমা ‘লিটল বয়’ (Little Boy) নিক্ষেপ করে আমেরিকা। ইউরেনিয়াম-ভিত্তিক এই পরমাণু বোমার আঘাতে এক লহমায় হিরোশিমা শহরের অর্ধাংশ সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এবং প্রায় এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার (১,৫০,০০০) নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। শহরের বাকি অর্ধাংশ মানুষ তাৎক্ষণিক মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পেলেও পরমাণু বোমার মারাত্মক তেজস্ক্রিয় বিকিরণের (Radioactive Fallout) দীর্ঘমেয়াদী প্রতিক্রিয়া নিয়ে বেঁচে থাকতে বাধ্য হন। অন্ধত্ব, দুরারোগ্য ক্যান্সার, পঙ্গুত্ব এবং নানাবিধ জটিল রোগব্যাধিতে জর্জরিত হয়ে তাঁদের জীবন এক জীবন্ত নরকে পরিণত হয়।
হিরোশিমার এই নজিরবিহীন মারণযজ্ঞ ঘটিয়েও মার্কিন সামরিক প্রশাসন স্তব্ধ হয়নি। প্রথম বিস্ফোরণের মাত্র তিন দিন পর, ১৯৪৫ সালের ৯ আগস্ট জাপানের অপর একটি শহর নাগাসাকিতে দ্বিতীয় পরমাণু বোমা ‘ফ্যাটম্যান’ (Fat Man)-এর বিস্ফোরণ ঘটায় আমেরিকা। প্লুটোনিয়াম-ভিত্তিক এই দ্বিতীয় বিস্ফোরণের দিনেই প্রাণ হারান আরও প্রায় ৫০,০০০ মানুষ। বোমা বিধ্বস্ত দুটি শহরের আবাসস্থল ও নাগরিক পরিকাঠামো ধূলিসাৎ হয়ে যায়। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, যুদ্ধের সাথে যাদের কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক ছিল না, সেই সাধারণ অসামরিক নাগরিকদের কেবল হত্যাই করা হয়নি, বরং তেজস্ক্রিয় বিকিরণের জিনগত প্রভাবে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও চিরতরে অসুস্থ ও পঙ্গু করে দেওয়া হয়। এই দুই ভয়াবহ বিস্ফোরণের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ পরবর্তী দশকগুলোতে জাপানে কত শিশু যে বিকলাঙ্গ ও প্রতিবন্ধী হয়ে জন্মগ্রহণ করেছে, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান আজও নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি।
১.৩ সামরিক যৌক্তিকতা নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক ও ঠান্ডা যুদ্ধের সূচনা
হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পরমাণু বোমা নিক্ষেপের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের (Harry S. Truman) নেতৃত্বে যুদ্ধের ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতি ও মর্মান্তিকতাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে আমেরিকায় বিজয় উৎসব পালন করা হয়। তৎকালীন মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোও যুদ্ধের এই নিষ্ঠুরতাকে আড়াল করে একে মার্কিন সামরিক ও প্রযুক্তিগত সাফল্য হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে জনমানসে তুলে ধরেছিল। সরকারিভাবে দাবি করা হয়েছিল, জাপানি যুদ্ধবাজদের দ্রুত শায়েস্তা করতে এবং দীর্ঘস্থায়ী স্থলযুদ্ধে মার্কিন সৈন্যদের প্রাণহানি এড়াতেই মানবতার খাতিরে এই চরম পদক্ষেপ নিতে হয়েছে।
কিন্তু সমসাময়িক নথিপত্র এবং খোদ মার্কিন সামরিক বাহিনীর শীর্ষস্থানীয় সেনানায়কদের পরবর্তীকালের স্বীকারোক্তি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, হিরোশিমা ও নাগাসাকির ঘটনা আদৌ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ জয়ের কোনো অপরিহার্য সামরিক প্রয়োজন ছিল না; বরং এর পেছনে কাজ করেছিল যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে মার্কিন আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ভূ-রাজনৈতিক কৌশল। পরমাণু বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপের রণাঙ্গনে পতনশীল জার্মানির রাজধানী বার্লিনে সোভিয়েত পতাকা উত্তোলনের পরেই আমেরিকা জাপানে পরমাণু বোমা ফেলার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। কারণ ইতিমধ্যে সোভিয়েত রাশিয়া জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল এবং মানচুরিয়া অঞ্চলে জাপানি সেনাবাহিনীকে পরাস্ত করে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছিল। বার্লিনে বিজয়ের পর সেখানে সোভিয়েত রাশিয়া, ব্রিটেন এবং আমেরিকা—এই তিন মিত্রশক্তিরই পতাকা উত্তোলিত হয়েছিল; কিন্তু প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সোভিয়েত প্রভাব খর্ব করতে আমেরিকা চেয়েছিল টোকিওতে যেন সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। বস্তুত, পরমাণু বোমা নিক্ষেপের মাধ্যমে জাপানের একক আত্মসমর্পণ আদায় করে টোকিওতে শেষ পর্যন্ত কেবল মার্কিন পতাকাই ওড়ানো হয়েছিল।
এমনকি খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের সচেতন নাগরিক সমাজ ও বুদ্ধিজীবী মহল সেদিন এই অমানবিক হত্যাকাণ্ডকে বিনা প্রশ্নে মেনে নেয়নি। ১৯৪৫ সালেই প্রকাশিত ডোনাল্ড পিটার গেডেস (Donald Porter Geddes) সম্পাদিত প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘দ্য অ্যাটমিক এজ ওপেনস’ (The Atomic Age Opens)-এর ৪৫ পৃষ্ঠার বিবরণ থেকে তৎকালীন পাশ্চাত্য সমাজের তীব্র নৈতিক প্রতিক্রিয়ার পরিচয় পাওয়া যায়। গ্রন্থটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বত্র সাধারণ মানুষ ও শত শত বুদ্ধিজীবী তাঁদের স্থানীয় সংবাদপত্রের সম্পাদকদের কাছে চিঠি লিখে জাপানে নিরীহ অসামরিক নাগরিকদের এই গণহত্যার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন এবং একে নৈতিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ও অমানবিক কাজ বলে অভিহিত করেছিলেন। ব্রিটেনেও পরমাণু বোমা নিক্ষেপের সংবাদ অন্য সমস্ত খবরকে ছাপিয়ে যায় এবং ব্রিটিশ সংবাদপত্রের চিঠিপত্রের কলামগুলো ‘ইন দ্য নেম অফ হিউম্যানিটি’ (In the name of humanity) বা মানবতার দোহাই দিয়ে এই প্রশ্ন তোলে যে, সভ্যতার নামে আমরা আসলে কোন ধ্বংসের পথে এগিয়ে চলেছি।
সামরিক দিক থেকেও এই বোমা নিক্ষেপ যে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় ছিল, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দুই সর্বোচ্চ মার্কিন সেনানায়কের আত্মজীবনীতে। দক্ষিণ-পশ্চিম প্যাসিফিক এবং জাপান অঞ্চলের সুপ্রিম কমান্ডার জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থার (General Douglas MacArthur) পরবর্তীকালে তাঁর আত্মচরিতে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্বীকার করেছেন যে, তাঁর সাথে কোনোপ্রকার পরামর্শ না করেই জাপানে পরমাণু বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছিল এবং সামরিকভাবে এর কোনো প্রয়োজনই ছিল না। জেনারেল ম্যাকআর্থারের নিজের কথায়, তাঁর অধীনস্থ সামরিক কর্মকর্তারা সর্বসম্মতভাবে নিশ্চিত ছিলেন যে জাপান তখন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে এবং আত্মসমর্পণের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে; এমনকি তিনি কোনো অতিরিক্ত সামরিক অভিযান ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে জাপান অধিগ্রহণের (Peaceful occupation of Japan) পরিকল্পনা প্রস্তুত করার নির্দেশও দিয়েছিলেন। অর্থাৎ জাপান যখন আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে কেবলমাত্র পরমাণু অস্ত্রের ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্যই এই বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।
একইভাবে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালে ইউরোপে মিত্রবাহিনীর সর্বোচ্চ সেনানায়ক এবং পরবর্তীকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ার (Dwight D. Eisenhower) তাঁর বিখ্যাত আত্মচরিত ‘ম্যান্ডেট ফর চেঞ্জ’ (Mandate for Change, 1953)-এ এই ঘটনার কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, পরাজিত জাপানের ওপর পরমাণু বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো ছিল সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়; কারণ মার্কিন সৈন্যদের জীবন বাঁচানোর জন্য এই অস্ত্রের ব্যবহার আর কোনো বাধ্যতামূলক পদক্ষেপ ছিল না এবং এমন এক ভয়াবহ মারণাস্ত্র ব্যবহার করে বিশ্বজনমতকে আতঙ্কিত করা থেকে আমেরিকার বিরত থাকা উচিত ছিল।
কিন্তু জেনারেল ম্যাকআর্থার বা আইজেনহাওয়ারের মতো সমরনায়কেরা যুদ্ধ-পরবর্তীকালে মার্কিন প্রশাসনের এই নৈতিক অপরাধ স্বীকার করে নিলেও, মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন সেই পথে হাঁটেনি। উল্টে পেন্টাগন বিশ্বজুড়ে মার্কিন সামরিক একাধিপত্য বজায় রাখার লক্ষ্যে নতুন উদ্যমে পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণ এবং মজুত করার নির্দেশ জারি করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা পারমাণবিক অস্ত্র মজুত ও প্ররোচনার প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বজুড়ে শুরু হয় ‘ঠান্ডা যুদ্ধ’ (Cold War)। আত্মরক্ষা এবং শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখার তাগিদে বিশ্বের অন্যান্য উন্নত রাষ্ট্রগুলোও দ্রুত পরমাণু বোমা, দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং জলের নিচে চলাচলকারী পারমাণবিক ডুবোজাহাজ নির্মাণের প্রতিযোগিতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের (১৯৪৫) পর তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৪৯ সালে, ব্রিটেন ১৯৫২ সালে, ফ্রান্স ১৯৬০ সালে এবং এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে চীন ১৯৬৪ সালে পরীক্ষামূলক পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিজেদের পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার গড়ে তোলে। এভাবেই একদিকে আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও কানাডা এবং অন্যদিকে সোভিয়েত রাশিয়া ও চীনকে কেন্দ্র করে বিশ্ব রাজনীতিতে একচেটিয়া আধিপত্যবাদী ‘নিউক্লিয়ার ক্লাব’ (Nuclear Club) আত্মপ্রকাশ করে।
১.৪ ভারতীয় নেতৃত্বের প্রাথমিক দর্শন ও শান্তিপূর্ণ পরমাণু চর্চার অঙ্গীকার
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি এবং ঠান্ডা যুদ্ধের এই উত্তপ্ত সূচনালগ্নেই ১৯৪৭ সালে ভারত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। সদ্য স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রনেতারা যখন দেশের ভবিষ্যৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনীতির রূপরেখা তৈরি করছিলেন, তখন তাঁদের সামনে পরমাণু শক্তির দুটি বিপরীতমুখী চিত্র স্পষ্ট ছিল। ১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট হিরোশিমা ও নাগাসাকির মর্মান্তিক মানবিক বিপর্যয় তৎকালীন ভারতীয় রাষ্ট্রনেতাদের মনে পরমাণু বোমা তৈরির ক্ষেত্রে এক গভীর মানসিক ও নৈতিক বাধা সৃষ্টি করেছিল। যুদ্ধবাজ রাজনীতির প্রভাবে লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষের মৃত্যু এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা তেজস্ক্রিয় পঙ্গুত্বের বিভীষিকা বিচার করে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু পরমাণু মারণাস্ত্রের বিরুদ্ধে অত্যন্ত জোরালো অবস্থান গ্রহণ করেন।
তবে পরমাণু বোমার বিরোধিতা করার অর্থ এই ছিল না যে ভারত আধুনিক পরমাণু বিজ্ঞান চর্চা থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখবে। ভারত স্বাধীনতা লাভের আগে থেকেই পণ্ডিত নেহরু দেশের দারিদ্র্য বিমোচন ও আধুনিকীকরণের জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার উন্নতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে এসেছিলেন। বিভিন্ন সভা-সমিতিতে দেওয়া ভাষণে তিনি পরমাণু শক্তির ধ্বংসাত্মক দিকটির বিরুদ্ধে যেমন বিশ্ববিবেককে সচেতন করেছিলেন, তেমনই এর গঠনমূলক প্রক্রিয়া সম্পর্কেও জাতিকে সুস্পষ্ট দিশা নির্দেশ দিয়েছিলেন। নেহরুর দর্শন ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট—উপনিবেশ-উত্তর ভারতের মূল লড়াই হলো অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা, বিদ্যুৎ সংকট এবং দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে; তাই মারণাস্ত্র নির্মাণের অর্থহীন প্রতিযোগিতায় জাতীয় সম্পদ অপচয় না করে কেবলমাত্র অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন, কৃষি ও চিকিৎসার তাগিদে পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
পণ্ডিত নেহরুর এই গঠনমূলক দর্শনের সাথে ভারতে পরমাণু শক্তি চর্চার জনক ড. হোমি জাহাঙ্গীর ভাবার বৈজ্ঞানিক দূরদর্শিতার এক চমৎকার মেলবন্ধন ঘটেছিল। ১৯৪৪ সালে—অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পরমাণু বোমার প্রথম পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটানোরও এক বছর আগে—বিজ্ঞানী ভাবা ভারতে একটি অত্যাধুনিক পারমাণবিক গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে টাটা গোষ্ঠীর সাথে আলোচনা শুরু করেছিলেন। ড. ভাবা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, ভারতে অত্যন্ত দক্ষ এবং কুশলী বিজ্ঞানীরা রয়েছেন এবং ধ্বংসাত্মক কাজে পরমাণু প্রযুক্তি ব্যবহার না করেও কেবলমাত্র শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পায়নের প্রভূত উন্নতির জন্য এই প্রযুক্তিকে সফলভাবে ব্যবহার করা সম্ভব।
এই ঐতিহাসিক ও নৈতিক প্রেক্ষাপটেই ভারতে পরমাণু গবেষণার যাত্রা শুরু হয়, যেখানে শুরু থেকেই পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারই সর্বোচ্চ প্রাধান্য পেয়েছিল। ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭৪ সালের প্রথম পোখরান বিস্ফোরণের পূর্ববর্তী সময়কাল পর্যন্ত ভারতীয় বিজ্ঞানীরা কেবল মারণাস্ত্র বা পরমাণু বোমা তৈরির উগ্র কৌতূহলে পরিচালিত হননি। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণ, ইউরেনিয়াম ও থোরিয়াম জ্বালানির গবেষণা এবং মৌলিক পদার্থবিদ্যার নিরবচ্ছিন্ন চর্চার মাধ্যমে ভারতীয় বিজ্ঞানীরা গোপনীয়তা বজায় রেখে এমন এক উচ্চমানের দেশীয় প্রযুক্তিগত ভিত্তি ও কারিগরি দক্ষতা অর্জন করেছিলেন, যা পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক চাপের মুখে ভারতকে এক সম্পূর্ণ স্বনির্ভর পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র এবং ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রযুক্তির অধিকারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সাহায্য করেছিল।