সমস্ত লেখাগুলি

ভারতের পরমাণু চর্চা (নবম পর্ব) : সমসাময়িক প্রেক্ষাপট ও ভারতের পরমাণু গবেষণার আধুনিক অগ্রগতি (২০০৬–বর্তমান) এবং উপসংহার -
Tushar Gorai
Nov. 1, 2026 | category | views:1 | likes:0 | share: 0 | comments:0

২০০৫ সালের জুলাই মাসে ভারত-মার্কিন অসামরিক পরমাণু চুক্তির প্রাথমিক রূপরেখা স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ভারতের পরমাণু কর্মসূচি এক দীর্ঘ ও পরিবর্তনশীল পথ অতিক্রম করেছে। বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ড. হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা এবং ড. মেঘনাদ সাহার মতো দূরদর্শী বিজ্ঞানীদের হাত ধরে যে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল, একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে তা এক পরিণত ও বহুমুখী রূপ লাভ করেছে। একদিকে আন্তর্জাতিক পরমাণু বাণিজ্যের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে বৈদেশিক জ্বালানি ও প্রযুক্তির সমন্বয়, অন্যদিকে দেশের নিজস্ব থোরিয়াম ভাণ্ডারকে কাজে লাগিয়ে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে উন্নত চুল্লি নির্মাণ—এই দুই ধারার সংমিশ্রণে ভারতের বর্তমান পরমাণু গবেষণা এগিয়ে চলেছে।

৯.১ ভারত-মার্কিন চুক্তির পরবর্তী বাস্তবতা, এনএসজি ছাড়পত্র ও পারমাণবিক দায়বদ্ধতা আইন

২০০৫ সালের ১৮ জুলাই মনমোহন সিং ও জর্জ বুশের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির পর ভারতের পরমাণু কেন্দ্রগুলোকে সামরিক ও অসামরিক—এই দুই ভাগে বিভক্ত করার যে জটিল প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তা ২০০৮ সালে চূড়ান্ত রূপ পায়। ভারত তার অসামরিক পারমাণবিক চুল্লিগুলোকে ধাপে ধাপে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) পরিদর্শনের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং এর বিনিময়ে ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ৪৮টি দেশের গোষ্ঠী ‘নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপ’ (NSG) ভারতকে এক ঐতিহাসিক বিশেষ ছাড়পত্র (Waiver) প্রদান করে। বিশ্বের একমাত্র এনপিটি (NPT)-বহির্ভূত পরমাণু অস্ত্রধর রাষ্ট্র হিসেবে ভারত আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অসামরিক পারমাণবিক জ্বালানি ও প্রযুক্তি কেনার বৈধ অধিকার লাভ করে।

তবে তৎকালীন সমালোচকদের এবং ভাবা পরমাণু গবেষণা কেন্দ্রের প্রাক্তন ডিরেক্টর ড. এ. এন. প্রসাদের আশঙ্কা অনেকটাই সত্য প্রমাণিত হয় যখন দেখা যায় যে, এই চুক্তির পরেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোনো বাণিজ্যিক পারমাণবিক চুল্লি ভারতে স্থাপিত হয়নি। এর প্রধান কারণ ছিল দু’টি: প্রথমত, মার্কিন বহুজাতিক সংস্থাগুলোর চুল্লির অত্যধিক মূল্য, যার ফলে উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রতি ইউনিট ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল। দ্বিতীয়ত, ২০১০ সালে ভারতীয় সংসদে গৃহীত ‘অসামরিক পারমাণবিক দায়বদ্ধতা আইন’ (Civil Liability for Nuclear Damage Act, 2010)। ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনার তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখে ভারত এই আইনে বিধান রাখে যে, কোনো পারমাণবিক চুল্লিতে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনা ঘটলে তার আর্থিক ক্ষতিপূরণের দায়ভার কেবল চুল্লি পরিচালনাকারী সংস্থার নয়, বরং চুল্লি সরবরাহকারী বিদেশি কোম্পানির ওপরেও বর্তাবে। মার্কিন সংস্থাগুলো (যেমন জেনারেল ইলেকট্রিক বা ওয়েস্টিংহাউস) এই দায়বদ্ধতার শর্ত মেনে নেয়নি। তবে এই চুক্তির প্রধান সুফল হিসেবে কাজাখস্তান, কানাডা, রাশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো থেকে ভারতের পুরনো ও নতুন চুল্লিগুলোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন ইউরেনিয়াম জ্বালানি আমদানির পথ প্রশস্ত হয়, যা ভারতের দেশীয় ইউরেনিয়ামের ঘাটতি মেটাতে সহায়তা করে।

৯.২ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সম্প্রসারণ ও বর্তমান উৎপাদন চিত্র

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এবং একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ভারতে যেখানে দশটি পরমাণু চুল্লি সক্রিয় ছিল এবং কাইগাতে দুটি ও রাজস্থানের কোটা অঞ্চলে দুটিসহ মোট চারটি চুল্লি নির্মাণের পথে ছিল, সেখানে গত দুই দশকে চুল্লির সংখ্যা ও উৎপাদন ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তৎকালীন পরিকল্পনা অনুযায়ী মহারাষ্ট্রের তারাপুরে, রাজস্থানে, কর্ণাটকের কাইগায় এবং তামিলনাড়ুর কুদানকুলামে আরও বারোটি নতুন চুল্লি বসানোর যে রূপরেখা তৈরি করা হয়েছিল, তার অধিকাংশই আজ বাস্তবায়িত হয়েছে বা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

ভারতের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের হালনাগাদ চিত্রটি নিচে তুলে ধরা হলো:

  •  সক্রিয় চুল্লি ও উৎপাদন ক্ষমতা: বর্তমানে (২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে) ভারতের বিভিন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে (তারাপুর, রাওয়াতভাটা, কালপাক্কাম, নারোরা, কাকরাপার, কাইগা এবং কুদানকুলাম) মোট ২৪ থেকে ২৫টি পারমাণবিক চুল্লি বাণিজ্যিকভাবে সক্রিয় রয়েছে এবং দেশের মোট পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৮,০০০ মেগাওয়াট (৮ গিগাওয়াট) অতিক্রম করেছে।
  •  দেশীয় প্রযুক্তির ৭০০ মেগাওয়াট চুল্লি: ড. হোমি ভাবার প্রদর্শিত স্বনির্ভরতার পথে হেঁটে ভারতের নিজস্ব সংস্থা ‘নিউক্লিয়ার পাওয়ার কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া লিমিটেড’ (NPCIL) সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে ৭০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার উন্নত ‘প্রেশারাইজড হেভি ওয়াটার রিঅ্যাক্টর’ (PHWR) বা ভারী জলের চুল্লি নির্মাণে সাফল্য অর্জন করেছে। গুজরাটের কাকরাপার পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৩ ও ৪ নম্বর ইউনিট (KAPS-3 & 4) এবং রাজস্থানের রাওয়াতভাটার ৭ নম্বর ইউনিট (RAPS-7) এই দেশীয় প্রযুক্তির উজ্জ্বল নিদর্শন।
  •  কুদানকুলাম ও রুশ সহযোগিতা: শান্তিপূর্ণ কাজে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহারে রাশিয়ার দীর্ঘদিনের সহযোগিতার ধারাবাহিকতায় তামিলনাড়ুর কুদানকুলামে রাশিয়ার কারিগরি সহায়তায় ১,০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি বিশাল ‘ভিভিইআর’ (VVER - হালকা জলের চুল্লি) ইতিমধ্যেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে এবং আরও চারটি অনুরূপ চুল্লি (ইউনিট ৩, ৪, ৫ ও ৬) নির্মাণের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে।

৯.৩ ভারতের ত্রিস্তরীয় পরমাণু কর্মসূচি এবং থোরিয়াম গবেষণার আধুনিক অগ্রগতি

ভারতের পরমাণু গবেষণার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো দেশের অভ্যন্তরে থাকা বিপুল থোরিয়াম ভাণ্ডারকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সম্পূর্ণ স্বনির্ভরতা অর্জন করা, যাতে দেশবাসীর জন্য সুলভে বিদ্যুতের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হয়। বিশ্বে মোট সঞ্চিত থোরিয়ামের প্রায় এক-চতুর্থাংশই ভারতের কেরালা, তামিলনাড়ু ও ওড়িশার উপকূলীয় মোনাজাইট বালিতে রয়েছে। কিন্তু প্রাকৃতিক থোরিয়াম-২৩২ নিজে সরাসরি বিভাজনযোগ্য (Fissile) জ্বালানি নয়; একে চুল্লির ভেতরে নিউট্রন শোষণের মাধ্যমে কৃত্রিম ফিসাইল জ্বালানি ইউরেনিয়াম-২৩৩-এ রূপান্তরিত করে তবেই শক্তি উৎপাদন করা সম্ভব। এই জটিল বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়নের জন্যই ড. হোমি ভাবা ভারতের ‘ত্রিস্তরীয় পরমাণু কর্মসূচি’ (Three-Stage Nuclear Programme) প্রণয়ন করেছিলেন:

১. প্রথম স্তর (প্রাকৃতিক ইউরেনিয়াম ও ভারী জলের চুল্লি): এই স্তরে প্রাকৃতিক ইউরেনিয়াম জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে ভারী জলের চুল্লিতে (PHWR) বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় এবং উপজাত পদার্থ হিসেবে প্লুটোনিয়াম-২৩৯ তৈরি হয়। ভারত এই প্রথম স্তরে ইতিমধ্যেই পূর্ণাঙ্গ সাফল্য ও স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে।

২. দ্বিতীয় স্তর (ফাস্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টর বা FBR): ১৯৪৮ সালের পরমাণু শক্তি আইনের গোপনীয়তার সুরক্ষায় ভারতীয় বিজ্ঞানীরা হাতে-কলমে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে ‘ফাস্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টর’ (Fast Breeder Reactor) বা দ্রুতগতির প্রজনন চুল্লি উদ্ভাবন করেছিলেন। এই চুল্লির বৈশিষ্ট্য হলো, এটি যতটা পারমাণবিক জ্বালানি খরচ করে, তার চেয়ে বেশি জ্বালানি উৎপাদন (Breed) করতে পারে। প্রথম স্তর থেকে প্রাপ্ত প্লুটোনিয়াম-২৩৯ জ্বালানির সাথে চারপাশে থোরিয়াম-২৩২-এর আবরণ (Blanket) ব্যবহার করে এই চুল্লিতে একদিকে বিদ্যুৎ এবং অন্যদিকে তৃতীয় স্তরের জন্য প্রয়োজনীয় ইউরেনিয়াম-২৩৩ জ্বালানি তৈরি করা হয়। ১৯৮৫ সালে কালপাক্কামে একটি পরীক্ষামূলক ‘ফাস্ট ব্রিডার টেস্ট রিঅ্যাক্টর’ (FBTR) স্থাপনের পর, সম্প্রতি (২০২৪ সালে) কালপাক্কামেই সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে নির্মিত ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বাণিজ্যিক ‘প্রোটোটাইপ ফাস্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টর’ (PFBR)-এ জ্বালানি ভরার (Core Loading) কাজ সম্পন্ন হয়েছে, যা ভারতের পরমাণু ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মাইলফলক।

৩. তৃতীয় স্তর (থোরিয়াম-ভিত্তিক উন্নত চুল্লি): এই চূড়ান্ত স্তরে থোরিয়াম-২৩২ এবং ইউরেনিয়াম-২৩৩-এর সমন্বয়ে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জ্বালানি চক্র গড়ে তোলা হবে। এর প্রস্তুতির জন্য কালপাক্কামে ইউরেনিয়াম-২৩৩ চালিত বিশ্বের একমাত্র সচল চুল্লি ‘কামিনী’ (KAMINI) গবেষণার কাজ করছে এবং ভাবা অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টার (BARC) ৩০০ মেগাওয়াটের ‘অ্যাডভান্সড হেভি ওয়াটার রিঅ্যাক্টর’ (AHWR) এবং গলিত লবণের চুল্লি (Molten Salt Breeder Reactor)-এর নকশা তৈরি করেছে। যদিও বাণিজ্যিক স্তরে বিপুল লগ্নি ও জটিল প্রযুক্তির বাধা পেরিয়ে তৃতীয় স্তরের পূর্ণ বাস্তবায়নে আরও কয়েক দশক সময়ের প্রয়োজন, তবুও ভারতীয় বিজ্ঞানীরা এই লক্ষ্যে নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

৯.৪ মৌলিক বিজ্ঞান, ফিউশন গবেষণা (ITER) ও সমাজকল্যাণে পরমাণু প্রযুক্তি

১৯৫৪ সালে ড. মেঘনাদ সাহার প্রস্তাবে গঠিত পরমাণু শক্তি দপ্তরের (DAE) অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মৌলিক গবেষণা এবং চুল্লি থেকে রেডিও আইসোটোপ বের করে এনে রোগের ঔষধ ও কৃষিতে ব্যবহারযোগ্য উপাদান প্রস্তুত করা। বর্তমান সময়ে ভারত সেই লক্ষ্যগুলো সার্থকভাবে পূরণ করে চলেছে:

  •  আন্তর্জাতিক ফিউশন গবেষণা ও মৌলিক বিজ্ঞান: প্রথম অধ্যায়ে আলোচিত পরমাণু সংযোজন বা ফিউশন (Fusion) প্রক্রিয়াকে ভবিষ্যতের নিরাপদ ও অফুরন্ত শক্তির উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফ্রান্সে অবস্থিত বিশ্বের সর্ববৃহৎ আন্তর্জাতিক ফিউশন গবেষণা প্রকল্প ‘ইটার’ (ITER - International Thermonuclear Experimental Reactor)-এ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে ভারত একটি পূর্ণাঙ্গ ও সমমর্যাদার অংশীদার রাষ্ট্র হিসেবে যুক্ত রয়েছে এবং প্রকল্পের অত্যাধুনিক ক্রায়োস্ট্যাট (Cryostat) সহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ভারত নিজে তৈরি করে সরবরাহ করেছে। এছাড়াও কলকাতার ভেরিয়েবল এনার্জি সাইক্লোট্রন সেন্টার (VECC) এবং ইন্দোরের রাজা রমান্না সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড টেকনোলজি (RRCAT/CAT) কণা ত্বরক, লেজার ও ক্রায়োজেনিক প্রযুক্তিতে বিশ্বমানের গবেষণা পরিচালনা করছে।
  •  চিকিৎসা ও কৃষিক্ষেত্রে প্রয়োগ: মুম্বাইয়ের ট্রম্বেতে ১৯৫৬ সালে নির্মিত ভারতের প্রথম গবেষণা চুল্লি ‘অপ্সরা’কে পরবর্তীতে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে আধুনিকীকরণ করে ২০১৮ সালে ‘অপ্সরা-আপগ্রেডেড’ (Apsara-U) হিসেবে পুনরায় চালু করা হয়েছে। এই চুল্লি এবং ‘ধ্রুব’ চুল্লি থেকে উৎপাদিত রেডিও আইসোটোপ আজ ভারতের লক্ষ লক্ষ ক্যান্সার রোগীর স্বল্পমূল্যে রেডিয়েশন থেরাপি ও রোগ নির্ণয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে। কৃষিক্ষেত্রে তেজস্ক্রিয় রশ্মির পরিমিত ব্যবহারের মাধ্যমে ভাবা পরমাণু গবেষণা কেন্দ্র (BARC) ডাল, তৈলবীজ ও ধানের অর্ধশতাধিক উচ্চফলনশীল ও খরা-সহনশীল বীজ উদ্ভাবন করেছে এবং খাদ্যশস্য দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য বিকিরণ প্রযুক্তি (Food Irradiation) দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দিয়েছে।
  •  জলবায়ু পরিবর্তন ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্যমাত্রা: কয়লা পুড়িয়ে তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনের ফলে পরিবেশে যে বিপুল কার্বন নিঃসরণ ঘটে, তার তুলনায় পরমাণু শক্তি একটি পরিচ্ছন্ন ও কার্বন-মুক্ত শক্তির উৎস। ভারত আগামী ২০৭০ সালের মধ্যে ‘নেট জিরো’ (Net Zero) বা শূন্য কার্বন নিঃসরণের যে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার করেছে এবং ২০৪৭ সালের মধ্যে ১ লক্ষ মেগাওয়াট (১০০ গিগাওয়াট) পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে, তা পূরণের জন্য বর্তমানে ছোট আকারের নিরাপদ চুল্লি বা ‘স্মল মডুলার রিঅ্যাক্টর’ (Bharat Small Reactors - BSR) তৈরির নতুন নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।

৯.৫ উপসংহার: সার্বভৌমত্ব, বিজ্ঞানমনস্কতা ও শান্তির অন্বেষণ

ভারতের পরমাণু চর্চার এই সুদীর্ঘ ও ঘটনাবহুল ইতিহাস কেবল কতগুলো পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণ বা পোখরানের মরুভূমিতে ঘটানো বিস্ফোরণের কারিগরি খতিয়ান নয়; এটি প্রকৃতপক্ষে উপনিবেশ-উত্তর একটি উন্নয়নশীল জাতির বৈজ্ঞানিক আত্মমর্যাদা, প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা এবং আন্তর্জাতিক একাধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক প্রামাণ্য দলিল। ১৯৪৪ সালে ড. হোমি জাহাঙ্গীর ভাবার হাত ধরে টাটা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা, ১৯৪৮ সালের পরমাণু শক্তি আইন এবং ১৯৫৪ সালে পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু ও ড. মেঘনাদ সাহার যৌথ প্রচেষ্টায় পরমাণু শক্তি দপ্তর (DAE) গঠনের মাধ্যমে ভারতে যে প্রাতিষ্ঠানিক বীজটি রোপিত হয়েছিল, তা শুরু থেকেই পরমাণু শক্তির ধ্বংসাত্মক রূপটিকে বর্জন করে মানবকল্যাণ ও অর্থনৈতিক বিকাশের শান্তিপূর্ণ পথকেই বেছে নিয়েছিল।

কিন্তু ঠান্ডা যুদ্ধের মেরুকরণ, তথাকথিত ‘নিউক্লিয়ার ক্লাব’-এর বৈষম্যমূলক চুক্তির (PTBT, NPT, CTBT) নাগপাশ এবং ভারতের প্রতিবেশী অঞ্চলে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার ভারতকে এক কঠিন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। ১৯৫৩ সালের থোরিয়াম বিতর্ক থেকে শুরু করে ১৯৭৪-এর প্রথম পোখরান এবং ১৯৯৮-এর দ্বিতীয় পোখরান পরীক্ষা পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের তীব্র নিষেধাজ্ঞা এবং অসহযোগিতা সত্ত্বেও ভারতীয় বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে, মৌলিক বিজ্ঞানচর্চা এবং দেশীয় প্রযুক্তির ভিত্তি যদি সুদৃঢ় হয়, তবে কোনো বৈদেশিক অবরোধই একটি দেশের অগ্রগতিকে রুখে দিতে পারে না। ‘পূর্ণিমা’ ও ‘ধ্রুব’ চুল্লি নির্মাণ, ফাস্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তির উদ্ভাবন এবং অগ্নি-৫ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো কৌশলগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিকাশ ভারতের সেই অদম্য বৈজ্ঞানিক স্বনির্ভরতারই ফসল।

একই সাথে এই ইতিহাস আমাদের এও স্মরণ করিয়ে দেয় যে, পরমাণু শক্তির ক্ষেত্রে বৈদেশিক শক্তির ওপর অতিনির্ভরতা—তা সে ১৯৬৩ সালের তারাপুর চুক্তিই হোক কিংবা ২০০৫ সালের ভারত-মার্কিন অসামরিক পরমাণু চুক্তিকে কেন্দ্র করে ইরান প্রশ্নে বৈদেশিক নীতির আপসই হোক—সবসময়ই দেশের স্বাধীন নীতি ও সুলভ জ্বালানি নিরাপত্তার সামনে নতুন সংকট তৈরি করেছে। হিরোশিমা ও নাগাসাকির সেই চরম মানবিক বিপর্যয়ের স্মৃতি এবং আধুনিক বিশ্বে পরমাণু অস্ত্রের বিস্তার ও সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি আজও মানব সভ্যতাকে তাড়া করে ফিরছে। তাই ভারতের পরমাণু নীতির সার্থকতা নিহিত রয়েছে একদিকে বৈষম্যহীন সার্বিক বিশ্ব পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের দাবিতে অবিচল থাকা এবং অন্যদিকে দেশের বিপুল থোরিয়াম সম্পদকে সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে কাজে লাগিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য সুলভ বিদ্যুৎ, উন্নত চিকিৎসা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্যে। পরমাণুর অন্তর্নিহিত অমিত শক্তি যখন পরাশক্তির কূটনৈতিক দাবার ঘুঁটি না হয়ে কেবলমাত্র মানবকল্যাণ ও সমাজের প্রগতির কাজে নিবেদিত হবে, তখনই ভারতের পরমাণু বিজ্ঞানীদের এই দীর্ঘ তপস্যা তার প্রকৃত পূর্ণতা লাভ করবে।

ভারতের পরমাণু চর্চা (অষ্টম পর্ব) : ভারত-মার্কিন অসামরিক পরমাণু চুক্তি (২০০৫) এবং ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ -
Tushar Gorai
Nov. 1, 2026 | category | views:1 | likes:0 | share: 0 | comments:0

১৯৯৮ সালের দ্বিতীয় পোখরান বিস্ফোরণের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর যে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল, একবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে পরিবর্তিত বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির তাগিদে ওয়াশিংটন ধীরে ধীরে সেই অবস্থান থেকে সরে আসতে শুরু করে। ঠান্ডা যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে নিজেদের একাধিপত্য বজায় রাখা, এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তিকে প্রতিহত করা এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নয়াদিল্লিকে পাশে পাওয়ার কৌশলগত উদ্দেশ্য থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সাথে পারমাণবিক সহযোগিতার নতুন পথ উন্মোচন করে। এরই চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০০৫ সালের জুলাই মাসে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ‘ভারত-মার্কিন অসামরিক পরমাণু চুক্তি’র মাধ্যমে। তবে এই চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর কেবল ভারতের অভ্যন্তরেই নয়, সমগ্র আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের স্বাধীন বৈদেশিক নীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং পারমাণবিক সার্বভৌমত্ব নিয়ে তুমুল বিতর্ক তৈরি হয়।

৮.১ ১৮ জুলাই ২০০৫-এর দ্বিপাক্ষিক চুক্তি: প্রতিশ্রুতি, ব্রিটেনের আপত্তি এবং সামরিক-অসামরিক বিভাজন

২০০৫ সালের ১৮ জুলাই ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং ওয়াশিংটন সফরে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ. বুশের সাথে ঐতিহাসিক ভারত-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক পরমাণু সহযোগিতা চুক্তিতে (যৌথ বিবৃতি বা ফ্রেমওয়ার্ক) স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তি অনুযায়ী মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, আমেরিকা ভারতকে একটি দায়িত্বশীল ‘পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র’ (অঘোষিত বা ডি-ফ্যাক্টো স্বীকৃতি) হিসেবে মেনে নেবে এবং ভারতের ওপর থেকে পারমাণবিক বাণিজ্যের সমস্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে সচেষ্ট হবে। চুক্তিতে স্থির হয় যে, কেবলমাত্র অসামরিক ক্ষেত্রে পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার এবং গবেষণার জন্য আমেরিকা ভারতকে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পারমাণবিক জ্বালানি (ইউরেনিয়াম), আধুনিক পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর বা চুল্লি এবং আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশ প্রদান করবে।

কিন্তু মার্কিন এই আশ্বাসের বিনিময়ে ভারতকেও বেশ কিছু কঠিন ও ব্যয়বহুল প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছিল।

প্রথমত, চুক্তির পরই আন্তর্জাতিক মঞ্চে আইনি বিতর্ক মাথাচাড়া দেয়। ভারত যেহেতু পরমাণু অস্ত্রপ্রসার রোধ চুক্তিতে (এনপিটি) স্বাক্ষর করেনি, তাই আন্তর্জাতিক পরমাণু বিধির দোহাই দিয়ে ব্রিটেন প্রাথমিক পর্যায়ে উপরিউক্ত ভারত-আমেরিকা পরমাণু চুক্তির বিরোধিতা করেছিল। ব্রিটেনের এই আপত্তি প্রচলিত আন্তর্জাতিক পরমাণু বিধিসম্মত হলেও, প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ভারতকে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে চুক্তি অনুযায়ী ভারত তার প্রতিশ্রুতিগুলো পালন করলে আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের জ্বালানি পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনোরূপ বাধা আসবে না। উল্লেখ্য, ১৮ জুলাই ২০০৫-এর এই চুক্তি অনুযায়ী আমেরিকা থেকে পারমাণবিক জ্বালানি নিতে গেলে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল এবং জর্জ বুশ এই বিষয়ে সাহায্য করবেন বলে কথা দিয়েছিলেন—যা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে ওই আন্তর্জাতিক সংস্থাটিতে মার্কিন আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ কতটা গভীর।

দ্বিতীয়ত, ভারতের পরমাণু শক্তি কেন্দ্রগুলোকে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শনের আওতায় আনতে গেলে ভারতের সামরিক (অস্ত্র নির্মাণকারী) এবং অসামরিক (বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী) পরমাণু শক্তিকেন্দ্রগুলোর মধ্যে এক স্পষ্ট বিভাজন রেখা টানা বাধ্যতামূলক করা হয়। কৌশলগত ও অর্থনৈতিক দিক থেকে এই বিভাজন ছিল ভারতের পক্ষে এক অত্যন্ত দুঃসাধ্য কাজ। কারণ, শুরু থেকেই ভারতের পরমাণু কর্মসূচি ছিল সমন্বিত; সেখানে সামরিক এবং অসামরিক পরমাণু কেন্দ্রগুলোকে আলাদা করে গড়ে তুলতে হলে সম্পূর্ণ নব্য প্রযুক্তি, বাড়তি গবেষণা সংস্থা এবং বিপুল পরিমাণ আর্থিক লগ্নির প্রয়োজন, যা ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতির ওপর এক বিরাট বোঝা। মার্কিনরা মূলত এই চুক্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মারফত ভারতের অভ্যন্তরীণ পরমাণু কার্যকলাপের ওপর স্থায়ী তদারকি বা নজরদারি কায়েম করতে চেয়েছিল, যাতে ভারত পরমাণু অস্ত্র নির্মাণ করছে কি না বা কত সংখ্যায় করছে তা সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

৮.২ ইরান বিতর্ক, গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প এবং ভারতের বৈদেশিক নীতির পরীক্ষা

ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তির সবচেয়ে বিতর্কিত ও তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক মূল্য ভারতকে চোকাতে হয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যে তার দীর্ঘদিনের মিত্র রাষ্ট্র ইরানের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরান-বিরোধী ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে ভারতের সঙ্গে ইরানের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে কার্যত বলি দিতে হয়েছিল।

এই কূটনৈতিক সংকটের কেন্দ্রে ছিল ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘ইরান-পাকিস্তান-ভারত’ (IPI) গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প। ইরান থেকে পাকিস্তানের স্থলভাগের মধ্য দিয়ে পাইপলাইন মারফত ভারতে সুলভে প্রাকৃতিক জ্বালানি গ্যাস আমদানির যে প্রক্রিয়া চলছিল, মার্কিন চাপের জেরে তা চরমভাবে বাধাপ্রাপ্ত হয়। ওয়াশিংটন পরোক্ষভাবে স্পষ্ট করে দেয় যে, ইরানের সাথে এই গ্যাস পাইপলাইন চুক্তি বাতিল এবং ইরান প্রশ্নে মার্কিন অবস্থানকে সমর্থন করার ওপরই নির্ভর করছে ১৮ জুলাইয়ের পরমাণু চুক্তি অনুসারে ভারত তার পরমাণু চর্চার জন্য আমেরিকা থেকে আদৌ ইউরেনিয়াম জ্বালানি পাবে কি না।

শেষ পর্যন্ত ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) বোর্ড অফ গভর্নরস-এর বৈঠকে ইরান নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল চাপের কাছে ভারত সরকার নতি স্বীকার করে। এই নতি স্বীকারের রূপটি ছিল আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থায় ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আমেরিকার তোলা আপত্তি ও অভিযোগগুলো বিনা প্রশ্নে মেনে নেওয়া। আমেরিকা চেয়েছিল ইরানের পরমাণু চর্চার বিরুদ্ধে প্রস্তাব আসুক এবং বিষয়টি ভিয়েনার পরমাণু সংস্থা থেকে সরিয়ে রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে (যেখানে ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা সম্ভব) উত্থাপন করা হোক। ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরের সেই ঐতিহাসিক ভোটাভুটিতে রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে ইরানের পরমাণু চর্চার বিষয়টি উত্থাপনের প্রস্তাবে ভারত তার দীর্ঘদিনের জোটনিরপেক্ষ নীতি ত্যাগ করে সরাসরি আমেরিকার পক্ষে ভোট দেয়।

সবচেয়ে বিস্ময়কর ও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় ছিল এই যে, ওই একই বৈঠকে রাশিয়া ও চীনসহ তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য প্রধান রাষ্ট্রগুলো—এমনকি মার্কিন মিত্র পাকিস্তানও—আমেরিকার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে গিয়ে ইরানের পক্ষ নিয়ে ভোটদান করেছিল বা নিরপেক্ষ থেকেছিল। তারা কেউই চায়নি যে নিরাপত্তা পরিষদে ইরানের প্রসঙ্গটি উঠুক; কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, ঐতিহাসিক মিত্র হওয়া সত্ত্বেও ভারত তা চেয়েছিল এবং মার্কিন প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছিল। ভারতের এই আকস্মিক নীতি পরিবর্তনের ফলে আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের বৈদেশিক রাষ্ট্রীয় নীতি নিয়ে যেমন তুমুল বিতর্ক ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়, তেমনই ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও (বিশেষত বামপন্থী ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে) প্রবল ঝড় ওঠে।

৮.৩ মার্কিন কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, হেনরি হাইড এবং চুক্তির অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সমালোচনা

২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইরানের বিরুদ্ধে পরমাণু চর্চা সংক্রান্ত মার্কিন প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়ে ভারতের বৈদেশিক নীতির স্বাধীনতা বিসর্জন দেওয়ার পরও, ভারত বিশেষ কোনো কূটনৈতিক সুবিধা বা সামগ্রিক ‘মার্কিন প্রেম’ জয় করতে পেরেছে কি না, তা নিয়ে অচিরেই গভীর সন্দেহ পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। খোদ মার্কিন মুলুকে ইরাক যুদ্ধ নিয়ে নিজের দেশের জনসমর্থন ধরে রাখতে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিলেন এবং সেই ব্যর্থতা ঢাকতেই ভারতকে পরমাণু চুক্তির প্রলোভন দেখিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ায় বিশেষ ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা অর্জন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে ভারতের এই সমর্থনের ফলেও মার্কিন আইনসভায় ভারতের প্রতি সহানুভূতির জোয়ার আসেনি।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং মার্কিন প্রশাসনের প্রশংসা কুড়িয়ে ভারতীয় রাষ্ট্রনেতাদের একাংশের মন জয় করতে পারলেও, মার্কিন কংগ্রেসের প্রভাবশালী সাংসদদের মন জয় করতে পারেননি। মার্কিন কংগ্রেসে ভারতের স্বাধীন পরমাণু গবেষণা ও অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে বিরোধিতা ক্রমশ তীব্র হয়ে ওঠে। মার্কিন আইনপ্রণেতারা আরও কিছু কঠোর শর্ত ও চুক্তি ভারতের ওপর চাপিয়ে দিয়ে ভারতকে পাকিস্তানের মতো একটি অনুগত বা তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রচেষ্টা চালান।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এই আলোচনা ও সমালোচনার ঝড়ের মধ্যে প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ অনেকটা নীরব ভূমিকা পালন করেন। অন্যদিকে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের (House of Representatives) আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির প্রধান হেনরি হাইড (যাঁর নামানুসারে পরবর্তীতে ২০০৬ সালে বিতর্কিত ‘হাইড অ্যাক্ট’ বা Hyde Act প্রণীত হয়) প্রকাশ্যে জানান যে, ভারতের সাথে ঠিক কী কী শর্তসাপেক্ষে পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহের চুক্তি করা হয়েছে, সে ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য মার্কিন কংগ্রেস সদস্যদের কাছ থেকে গোপন করে রাখা হয়েছে। প্রথম পোখরান বিস্ফোরণের কথা মাথায় রেখে আমেরিকা যে কঠোর পরমাণু আইন তৈরি করেছিল, দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ফলে সেই আইনের হাত থেকে ভারত আদৌ কতটা ছাড় পাবে, তা নিয়ে তখন থেকেই গভীর সংশয় দেখা দেয়। বস্তুত, ইরানের বিরুদ্ধে ভোটদানের মাধ্যমে মার্কিনিরা ভারতে একটি বাম-বিরোধী ও মার্কিন-অনুসারী বিদেশনীতিকে উৎসাহিত করতে চেয়েছিল, যদিও ভারতের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক চাপে তাদের সেই স্বপ্ন সম্পূর্ণ সফল হয়নি।

ভারতের নিজস্ব বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই চুক্তির প্রবল সমালোচনা করা হয়। ভারতে মার্কিন-প্রেমীদের মুখে তখন আজব সব সম্ভাবনার কথা শোনা যাচ্ছিল যে, বিশ্বে গণতন্ত্রের প্রসার, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং মানবাধিকার সম্প্রসারণ প্রভৃতি প্রশ্নে নয়াদিল্লিকে ঘনিষ্ঠ সহযোগী করে তুলতে আমেরিকা অত্যন্ত আগ্রহী। কিন্তু সমালোচকরা সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন তোলেন যে, আমেরিকা যদি ভারতকে প্রকৃতই সমমর্যাদার সহযোগী মনে করে, তবে রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের প্রশ্নে তারা নীরব কেন? আসলে আমেরিকা নিষেধাজ্ঞার ভয় ও জ্বালানির প্রলোভন দেখিয়ে ভারতের পরমাণু কেন্দ্রগুলোকে আন্তর্জাতিক অ্যাটমিক কমিশনের (আইএইএ) পরিদর্শনের চুক্তিতে বাঁধতে চাইছিল। অথচ ওই আন্তর্জাতিক সংস্থার কোনো অধিকারই নেই তথাকথিত নিউক্লিয়ার ক্লাবের স্বীকৃত চার-পাঁচটি রাষ্ট্রের সামরিক পরমাণু কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করার। প্রতিবেশী চীন আপন সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে সেই আন্তর্জাতিক কমিশনের এহেন একতরফা খবরদারিকে প্রত্যাখ্যান করেছে; কিন্তু ভারতের সেই সাধ্য বা দৃঢ়তা এই চুক্তিতে দেখা যায়নি, কারণ পরমাণু জ্বালানির জন্য ভারত মার্কিন করুণার প্রত্যাশী হয়ে পড়েছিল।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও মার্কিন পরমাণু রিঅ্যাক্টর ও জ্বালানি আমদানির সিদ্ধান্তটি ছিল ভারতের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল। বিশেষজ্ঞদের মতে, চড়া দামে মার্কিন পরমাণু রিঅ্যাক্টর কেনার ফলে ভারতে উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রতি ইউনিট ব্যয় অনেকখানি বেড়ে যাবে এবং মার্কিন বহুজাতিক সংস্থাগুলোর চড়া দামের প্রভাবে সুলভে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য ও দেশের সামগ্রিক প্রয়োজন থেকে ভারতকে সরে আসতে হবে। পরমাণু শক্তি গবেষণায় এবং নিজস্ব বিপুল থোরিয়াম ভাণ্ডারকে কাজে লাগিয়ে থোরিয়াম-চালিত রিঅ্যাক্টর তৈরিতে ভারত যদি সম্পূর্ণ স্বনির্ভর হতে পারত, তবেই কেবল দেশবাসীর জন্য সুলভে বিদ্যুতের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হতো। কিন্তু দেশীয় প্রযুক্তিতে ব্যাপক লগ্নি না করে একরকমভাবে মার্কিন কৃপার ওপর নির্ভর করার ফলে ভারত তার প্রকৃত স্বনির্ভরতার লক্ষ্যের ধারেকাছেও আসতে পারবে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। এই কারণেই ভাবা পরমাণু গবেষণা কেন্দ্রের (BARC) প্রাক্তন ডিরেক্টর ড. এ. এন. প্রসাদ এই চুক্তির তীব্র সমালোচনা করে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছিলেন— “মার্কিন চুক্তি ভারতকে সাহায্য করার জন্য নয়, বরং ভারতের নিজস্ব পরমাণু কর্মসূচিকে প্রতিহত করার জন্যই তৈরি করা হয়েছে।” সার্বিক বিচারে, ভারত-আমেরিকা পরমাণু চুক্তি যে ভারতের স্বনির্ভরতার পক্ষে খুব একটা লাভজনক হয়েছে, তা নিঃসংশয়ে বলা যায় না।

৮.৪ বহুমেরু বিশ্ব, চীন-রাশিয়া অক্ষ এবং সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (SCO)

ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তির এই জটিল সমীকরণকে কেবল দুটি দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নিরিখে দেখলে চলবে না; একে বুঝতে হবে একবিংশ শতাব্দীর পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে, যেখানে একমেরু বিশ্বের বদলে ‘বহুমেরু বিশ্ব’ (Multipolar World) গড়ে তোলার লড়াই শুরু হয়েছিল। ১৯৭৪ সালে ভারতের প্রথম পোখরান বিস্ফোরণের সময় আমেরিকার তীব্র নিষেধাজ্ঞার মূল কারণ ছিল বিশ্বে মার্কিন একাধিপত্য বজায় রাখা। নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ঠান্ডা যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলেও আমেরিকা তার সামরিক শক্তি ও অস্ত্রখাতে ব্যয় ক্রমাগত বৃদ্ধি করে চলে, অথচ উল্টে চীনের ওপর দোষারোপ করতে থাকে সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ানোর জন্য। ইরাক, আফগানিস্তান এবং পরবর্তীতে ইরানের ওপর মার্কিন আগ্রাসী নীতি ও কূটনীতির জন্যই বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবাদ আরও মারমুখী হয়ে ওঠে।

এই মার্কিন একাধিপত্যের বিপরীতে একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে চীন ও রাশিয়ার কৌশলগত আঁতাত ওয়াশিংটনের ঘুম কেড়ে নেয়। একটি ভারসাম্যপূর্ণ বহুমেরু বিশ্ব আধুনিক মানব সভ্যতার কাম্য হলেও আমেরিকা বরাবরই তার পরিপন্থী। এমনকি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে মার্কিন যুদ্ধের একতরফা নীতির কারণে ইউরোপের দুই প্রধান শক্তি জার্মানি এবং ফ্রান্সও সর্বক্ষেত্রে আমেরিকাকে পূর্ণ সমর্থন দেয়নি।

এই ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতের অবস্থান হয়ে ওঠে অত্যন্ত সংবেদনশীল। ভারতের দীর্ঘতম সীমান্ত থাকা প্রতিবেশী দেশ হলো চীন, এবং একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে চীনের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্রমাগত উন্নতি ঘটছিল। কিন্তু ভারত-মার্কিন পরমাণু সহযোগিতা চুক্তির ফলে আন্তর্জাতিক স্তরে ভারত, আমেরিকা এবং চীনকে নিয়ে গঠিত ত্রিপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে নতুন করে জটিলতা বাড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। আন্তর্জাতিক প্রশ্নের দিকে তাকিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং আমেরিকার সাংবাদিক সম্মেলনে দাঁড়িয়েই বলতে বাধ্য হয়েছিলেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এই চুক্তির ফলে চীনের সাথে ভারতের সম্পর্কে কোনো অবনতি ঘটবে না এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি চীনের সাথেও ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে ভারত সমানভাবে আগ্রহী।

বস্তুত, ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তি সম্পন্ন হওয়া মানেই যে মার্কিন শক্তির কাছে ভারতের সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ বা পরাজয় ঘটেছে, বিষয়টি তেমন একরৈখিক নয়। কারণ, একই সময়ে ইউরেশিয়া অঞ্চলে মার্কিন একাধিপত্যকে প্রত্যক্ষভাবে চ্যালেঞ্জ জানাতে রাশিয়া এবং চীনের জোট পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নের আরও কয়েকটি মধ্য এশীয় রাষ্ট্রকে সাথে নিয়ে গড়ে তোলে এক নতুন ও শক্তিশালী আঞ্চলিক রাষ্ট্রজোট—‘সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন’ (Shanghai Cooperation Organisation - SCO)। রুশ-চীন নেতৃত্বাধীন এই নতুন জোটটি যখন ভারত এবং ইরানকে তাদের সহযোগী ও সঙ্গী হিসেবে পাওয়ার ব্যবস্থা করে (উল্লেখ্য, ২০০৫ সালেই ভারত ও ইরান এসসিও-তে পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের মর্যাদা পায় এবং পরবর্তীকালে ২০১৭ সালে ভারত ও ২০২৩ সালে ইরান এর পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করে), তখন তা একমেরু বিশ্বে মার্কিন প্রাধান্যকে এক প্রবল কূটনৈতিক আঘাত দেয়। এভাবেই একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অসামরিক পরমাণু চুক্তির মাধ্যমে প্রযুক্তিগত অচলাবস্থা কাটানোর চেষ্টা এবং অন্যদিকে রাশিয়া-চীন-ইরানের সাথে বহুমেরু বিশ্বের মঞ্চে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখার এক পিচ্ছিল ও জটিল কূটনৈতিক পথ ধরে ভারত একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে অগ্রসর হয়।

ভারতের পরমাণু চর্চা (সপ্তম পর্ব) : বৈশ্বিক পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার, দক্ষিণ এশীয় প্রতিযোগিতা ও অ-রাষ্ট্রীয় ঝুঁকি -
Tushar Gorai
Nov. 1, 2026 | category | views:1 | likes:0 | share: 0 | comments:0

১৯৯৮ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের পাল্টাপাল্টি পারমাণবিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ও সামরিক মানচিত্র চিরতরে বদলে যায়। ১৯৪৫ সালের আগস্টে হিরোশিমা ও নাগাসাকির ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের পর বিশ্বজুড়ে পরমাণু অস্ত্রের বিরুদ্ধে তীব্র নৈতিক প্রতিবাদ গড়ে উঠলেও, বিদেশি শত্রুর আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করার তাগিদে বিশ্বের প্রধান রাষ্ট্রগুলো সামরিক অস্ত্রসম্ভারে পারমাণবিক বোমা মজুত করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থেকেছে। পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর তথাকথিত ‘নিউক্লিয়ার ক্লাব’-এর একচেটিয়া আধিপত্য, দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের গোপন পরমাণু কর্মসূচির বিকাশ, ভারতের নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং একবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে অ-রাষ্ট্রীয় বা সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর হাতে পরমাণু অস্ত্র চলে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক জটিল সমীকরণ তৈরি হয়েছে।

৭.১ বৈশ্বিক পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার: কার ভাণ্ডারে কত বোমা ও আধুনিকীকরণ

বিশ্বের কোন রাষ্ট্রের ভাণ্ডারে ঠিক কতগুলো পরমাণু বোমা মজুত রয়েছে, তা নিয়ে সামরিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিভিন্ন মতভেদ রয়েছে, কারণ প্রতিটি রাষ্ট্রই তাদের কৌশলগত অস্ত্রভাণ্ডারের তথ্য চরম গোপনীয়তার সাথে রক্ষা করে। তবুও ঐতিহাসিক পরীক্ষা এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর সক্ষমতার একটি তুলনামূলক চিত্র পাওয়া যায়।

  •  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র: ১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই ভোর সাড়ে পাঁচটায় নিউ মেক্সিকোর মরুভূমিতে মানব ইতিহাসের প্রথম পরীক্ষামূলক আণবিক বিস্ফোরণটি ঘটিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেই শুরু থেকে পরবর্তী দশকগুলোতে আমেরিকা বহুবার বাস্তব পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। পরবর্তীকালে কম্পিউটার প্রযুক্তিতে প্রভূত উন্নয়ন হওয়ার ফলে মার্কিন বিজ্ঞানীদের হাতে আসে কম্পিউটার সিমুলেশন পদ্ধতিতে (সাব-ক্রিটিক্যাল টেস্ট) পারমাণবিক পরীক্ষা চালানোর অত্যাধুনিক সুযোগ। ২০০১ সালে আমেরিকার ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের যমজ সৌধ দুটি সন্ত্রাসবাদী হামলায় বিধ্বস্ত হওয়ার পর, বিশ্ব থেকে সন্ত্রাসবাদ দূর করার অজুহাতে মার্কিন সামরিক খাতে পারমাণবিক চর্চা আরও দ্রুততর হয়েছে। কেবল পারমাণবিক বোমাই নয়, সেই বোমা বহনকারী অত্যাধুনিক দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রও মার্কিন সামরিক অস্ত্রভাণ্ডারে বিপুল সংখ্যায় শামিল হয়েছে। আধুনিক আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান (যেমন স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট বা SIPRI-এর সাম্প্রতিকতম তথ্য) অনুযায়ী, বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারে অবসরপ্রাপ্ত ও মজুত মিলিয়ে মোট প্রায় ৫,০০০-এর বেশি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১,৭৭০টি ওয়ারহেড সার্বক্ষণিক সক্রিয় বা মোতায়েন (Deployed) অবস্থায় রাখা হয়েছে।
  •  রাশিয়া (তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন): মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বমঞ্চে দ্বিতীয় দেশ হিসেবে ১৯৪৯ সালে সফল পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটায় তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। সংখ্যাগত দিক থেকে রাশিয়ার অস্ত্রভাণ্ডারে মার্কিনিদের থেকেও বেশি পারমাণবিক বোমা মজুত রয়েছে। তবে দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি অনুযায়ী তাদের বহু বোমা বর্তমানে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রাখা আছে। তা সত্ত্বেও, রাশিয়ার বোমা বহনকারী আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র (ICBM) প্রযুক্তি অত্যন্ত উন্নত ও মারাত্মক। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক হিসাব অনুযায়ী, রাশিয়ার কাছে বর্তমানে বিশ্বের সর্ববৃহৎ পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার রয়েছে, যার মোট সংখ্যা প্রায় ৫,৫০০-এর কাছাকাছি এবং এর মধ্যে প্রায় ১,৭১০টি ওয়ারহেড সক্রিয়ভাবে মোতায়েন করা রয়েছে।
  •  ব্রিটেন: ১৯৫২ সালে ব্রিটেন তাদের প্রথম পরীক্ষামূলক পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটায়। এরপর বহুবার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটানোর পর ব্রিটেন উন্নত মানের পারমাণবিক বোমা বানানোর ক্ষেত্রে পূর্ণ সফলতা লাভ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়ার তুলনায় ব্রিটেনের অস্ত্রভাণ্ডারে পরমাণু বোমার সংখ্যা কম হলেও, তাদের কাছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী বেশ কিছু বোমা (বর্তমানে প্রায় ২২৫টি ওয়ারহেড, যা মূলত সাবমেরিন-ভিত্তিক ট্রাইডেন্ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থায় যুক্ত) মজুত রয়েছে।
  •  ফ্রান্স: ইউরোপের অপর পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র ফ্রান্স ১৯৬০ সালে তাদের প্রথম পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণটি ঘটায়। ব্রিটেনের মতোই ফ্রান্সের সামরিক অস্ত্রভাণ্ডারেও নির্দিষ্ট কিন্তু অত্যন্ত আধুনিক কিছু পরিমাণে পারমাণবিক বোমা (বর্তমানে প্রায় ২৯০টি ওয়ারহেড) স্থান পেয়েছে।
  •  চীন: তৃতীয় বিশ্বের এবং এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে চীনই প্রথম পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে ১৯৬৪ সালে। চীনের অস্ত্রভাণ্ডারে অনেকগুলো পারমাণবিক বোমা মজুত রয়েছে এবং তাদের বোমা বহনকারী দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিও যথেষ্ট উন্নত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন তাদের পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সম্প্রসারণ করছে এবং বর্তমান বৈশ্বিক প্রাক্কলন অনুযায়ী তাদের কাছে থাকা পরমাণু ওয়ারহেডের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে ৬০০-এর দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
  •  ইসরায়েল ও অন্যান্য দেশের পরিস্থিতি: স্বীকৃত পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর বাইরে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের অবস্থান অত্যন্ত রহস্যময়। সংখ্যায় কম হলেও আন্তর্জাতিক সামরিক বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিতভাবে মনে করেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদতে ইসরায়েলের সামরিক অস্ত্রভাণ্ডারে পারমাণবিক বোমা (আনুমানিক ৯০টি ওয়ারহেড) স্থান পেয়েছে; যদিও কৌশলগত অস্পষ্টতার নীতি অনুসরণ করে ইসরায়েল নিজেকে কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক শক্তির অধিকারী রাষ্ট্র বলে পরিচয় দেয়নি। এছাড়াও বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ও একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ধারাবাহিকভাবে অভিযোগ তোলা হয়েছিল যে লিবিয়া, ইরান ও গণতান্ত্রিক কোরিয়া (উত্তর কোরিয়া)-এর ভাণ্ডারে গোপনে পরমাণু বোমা রয়েছে; যদিও ২০০৫ সাল পর্যন্ত এসবের কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে হালনাগাদ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, লিবিয়া তাদের প্রারম্ভিক কর্মসূচি পরিত্যাগ করলেও এবং ইরানের কর্মসূচি নিয়ে আজও কূটনৈতিক টানাপোড়েন চললেও, উত্তর কোরিয়া পরবর্তীকালে (২০০৬ সাল থেকে) একাধিকবার প্রকাশ্য পরমাণু পরীক্ষা চালিয়ে নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার গড়ে তুলেছে।

৭.২ দক্ষিণ এশীয় প্রতিযোগিতা ও পাকিস্তানের পরমাণু কর্মসূচির নেপথ্য ইতিহাস

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের পরমাণু কর্মসূচি ছিল সম্পূর্ণভাবে ভারত-কেন্দ্রিক এবং পশ্চিমা বিশ্বের পরোক্ষ প্রশ্রয়ে লালিত। ১৯৯৮ সালের মে মাসে ভারতের দ্বিতীয় পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানোর ঠিক পরেই ২৮ মে পাকিস্তানে প্রথমবার প্রকাশ্য পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। কিন্তু পাকিস্তানের এই পরমাণু বোমা তৈরির তোড়জোড় শুরু হয়েছিল মূলত ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর থেকেই। ১৯৭১ সালের যুদ্ধে ভারতের সামরিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর, ভারতের প্রচলিত সামরিক প্রাধান্যের মোকাবিলা করতে পাকিস্তান যেকোনো মূল্যে পারমাণবিক বোমা বানানোর জন্য তৎপর হয়ে ওঠে।

পাকিস্তানের এই পারমাণবিক কর্মসূচির প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন পাকিস্তানি পরমাণু বিজ্ঞানী মুনির আহমেদ খান, যিনি ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষাপ্রাপ্ত একজন দক্ষ নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ার। এছাড়া অস্ট্রিয়ার ভিয়েনাতে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অ্যাটমিক এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনে (IAEA) দীর্ঘদিন কাজ করার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাও তাঁর ছিল। সত্তরের দশকে পাকিস্তানে পারমাণবিক চর্চার প্রাথমিক পরিকাঠামো তৈরি এবং দক্ষ প্রযুক্তিবিদ গড়ে তোলার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ফ্রান্স উভয়েই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসে। বিশেষ করে ১৯৭৪ সালে ভারতের প্রথম পোখরান বিস্ফোরণের পর মার্কিন পররাষ্ট্রসচিব হেনরি কিসিঙ্গার পাকিস্তানকে নতুন সামরিক সাহায্যের বন্দোবস্ত করে দেন এবং ফ্রান্সের সাহায্যে পাকিস্তানে একটি প্লুটোনিয়াম চুল্লি স্থাপনের ব্যবস্থাও করা হয়।

তবে পাকিস্তানে পারমাণবিক বোমা নির্মাণের বাস্তব ও চূড়ান্ত সাফল্যের পেছনে ধাতুবিদ্যা বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল কাদের খানের ভূমিকা ছিল অনবদ্য। প্লুটোনিয়াম পথের পাশাপাশি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের (Uranium Enrichment) গোপন পথ বেছে নেন আব্দুল কাদের খান। তিনি ডাচ (নেদারল্যান্ডস) উৎস থেকে গোপন কারিগরি সহায়তা ও নকশা সংগ্রহ করেন এবং পারমাণবিক কাজকর্মে পারদর্শী ইউরোপীয় বহুজাতিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ‘ইউরোপিয়ান ইউরেনিয়াম এনরিচমেন্ট কোম্পানি’ (URENCO)-এর প্রযুক্তি ও সংযোগকে কাজে লাগিয়ে গোপনে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের পশ্চিমে কাহুটা অঞ্চলে এক বিশাল পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র গড়ে তোলেন।

আন্তর্জাতিক কূটনীতির সবচেয়ে বড় দ্বিচারিতা ছিল এই যে, কাহুটা কেন্দ্রের এই গোপনীয়তা বিশ্বের সাধারণ সংবাদ জগতে বজায় থাকলেও মার্কিন প্রশাসনের কাছে তা নিশ্চিতভাবেই অজানা ছিল না। এমনকি আন্তর্জাতিক পরমাণু তদারকি সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন’ (IAEA)-এর কাছেও পাকিস্তানের এই গোপন তৎপরতা অজানা ছিল না; কিন্তু সংস্থাটি মূলত মার্কিন কূটনীতির প্রভাবেই নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় এবং আশির দশকে আফগানিস্তানে সোভিয়েত বিরোধী যুদ্ধে পাকিস্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মিত্র হওয়ায় ওয়াশিংটন জেনেবুঝেও পাকিস্তানের এই পরমাণু অস্ত্র নির্মাণ প্রক্রিয়াকে উপেক্ষা করে গিয়েছিল।

৭.৩ ভারতের কৌশলগত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, ‘নো ফার্স্ট ইউজ’ নীতি ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি

উত্তরে চীন এবং পশ্চিমে পাকিস্তানের মতো দুটি পরমাণু অস্ত্রধর প্রতিবেশী রাষ্ট্রের উপস্থিতির কারণে ভারতকে তার নিজস্ব কৌশলগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা ‘ক্রেডিবল মিনিমাম ডিটারেন্স’ (Credible Minimum Deterrence) গড়ে তুলতে হয়েছে। ১৯৭৪ সালে প্রথম পরমাণু বিস্ফোরণ এবং তার চব্বিশ বছর পর ১৯৯৮ সালে দ্বিতীয় দফার সফল বিস্ফোরণের মাধ্যমে ভারত তার পারমাণবিক অস্ত্রের নকশা ও কার্যকারিতা সম্পূর্ণ প্রমাণ করেছে। প্রদত্ত ঐতিহাসিক প্রাক্কলন ও সমসাময়িক সক্ষমতা মিলিয়ে ভারতের ভাণ্ডারে মজুত ও সম্ভাব্য পরমাণু বোমার সংখ্যা ২০০ থেকে ২৫০-এর কাছাকাছি (সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা সমীক্ষা অনুযায়ী বর্তমানে ভারতের কাছে প্রায় ১৭০ থেকে ১৮০টি সক্রিয় কৌশলগত নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড এবং পর্যাপ্ত অস্ত্র-গ্রেড প্লুটোনিয়াম মজুত রয়েছে)।

তবে বিপুল পরমাণু সক্ষমতা অর্জন করলেও ভারত বরাবরই একটি অত্যন্ত দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের পরিচয় দিয়েছে। ১৯৯৮ সালের পরীক্ষার পরেই তৎকালীন প্রতিরক্ষা বিজ্ঞানী ও পরবর্তীকালের রাষ্ট্রপতি ড. এপিজে আব্দুল কালাম স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে, ভারত স্বেচ্ছায় আর নতুন কোনো পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটবে না এবং ভারতের পক্ষ থেকে কখনোই কোনো দেশের বিরুদ্ধে পরমাণু অস্ত্রের প্রথম প্রয়োগ (No First Use - NFU) করা হবে না। ভারতের পরমাণু নীতি সম্পূর্ণভাবে আত্মরক্ষামূলক—অর্থাৎ ভারতের ওপর যদি কোনো পারমাণবিক আঘাত আসে, তবেই কেবল ভারত তার চূড়ান্ত প্রত্যুত্তর দেবে।

কেবল পরমাণু বোমা তৈরি করাই যথেষ্ট নয়, শত্রুপক্ষের যেকোনো লক্ষ্যবস্তুতে সেই বোমা নিখুঁতভাবে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী বাহন বা ডেলিভারি সিস্টেম। ভারতীয় বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের নিরবচ্ছিন্ন চর্চার ফলে ভারত কেবল পরমাণু বোমা নয়, বরং বোমা বহনকারী দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণেও সম্পূর্ণ স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে। যদিও ভারত যখনই নিজস্ব প্রযুক্তিতে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে চেয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তখনই তার বিরোধিতা করেছে; তবুও ড. আব্দুল কালামের নেতৃত্বে ভারতের ‘ইন্টিগ্রেটেড গাইডেড মিসাইল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম’ (IGMDP) অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করে।

ভারতের পরমাণু বোমা বহনকারী সর্বাধুনিক ও সর্বোচ্চ পাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র হলো ‘অগ্নি-৫’ (Agni-V)। ৫,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি পাল্লার এই অগ্নি-৫ ক্ষেপণাস্ত্র সমগ্র এশিয়া এবং ইউরোপ ও আফ্রিকার একাংশকে ভারতের প্রতিরক্ষা বলয়ের আওতায় নিয়ে এসেছে। সাম্প্রতিকতম প্রযুক্তির সংযোজনে (যেমন ‘মিশন দিব্যাস্ত্র’-এর মাধ্যমে অর্জিত MIRV বা মাল্টিপল ইন্ডিপেন্ডেন্টলি টার্গেটেবল রি-এন্ট্রি ভেহিকেল প্রযুক্তি) একটি মাত্র অগ্নি-৫ ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যেই একসাথে একাধিক পরমাণু বোমা ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে নিক্ষেপ করার সক্ষমতা ভারত অর্জন করেছে। স্থলভিত্তিক ‘পৃথ্বী’ ও ‘অগ্নি’ সিরিজের ক্ষেপণাস্ত্র এবং যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি ভারত সমুদ্রের নিচে চলাচলকারী দেশীয় প্রযুক্তির পারমাণবিক ডুবোজাহাজ (যেমন—আইএনএস অরিহন্ত ও আইএনএস আরিঘাত) এবং সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপযোগ্য ব্যালিস্টিক মিসাইল (SLBM) তৈরি করে তার ‘নিউক্লিয়ার ট্রায়াড’ (Nuclear Triad—স্থল, আকাশ ও জলপথ থেকে পরমাণু হামলার সক্ষমতা) সম্পূর্ণ করেছে।

৭.৪ অ-রাষ্ট্রীয় বা বেসরকারি অধিকারে পরমাণু বোমা: সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি ও ভূ-রাজনৈতিক সত্যতা

একবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মহলে সবচেয়ে বড় যে আতঙ্কটি দেখা দেয়, তা হলো কোনো রাষ্ট্রের বাইরে বেসরকারি বা সন্ত্রাসবাদী সংস্থার হাতে পরমাণু অস্ত্র চলে যাওয়ার সম্ভাবনা। ২০০৫ সালের ২০ আগস্ট ভারতের সংবাদ সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া (PTI) এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে জানায় যে, মার্কিন গোয়েন্দা ও সামরিক কর্তাদের আশঙ্কা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংস্থা আল-কায়েদার হাতে পরমাণু বোমা রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই (FBI)-এর প্রাক্তন কর্মকর্তা ও পরামর্শদাতা পল উইলিয়ামস (Paul L. Williams) এই দাবিটি করেছিলেন, যা মূলত মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের অনুমোদনের বাইরে ছিল না। পিটিআই-এর ওই খবরে আরও বলা হয়েছিল যে, পরমাণু অস্ত্র প্রযুক্তির জন্য আল-কায়েদা প্রাক্তন রুশ ও পাকিস্তানি পরমাণু বিজ্ঞানীদের কাজে লাগিয়েছে।

এর ঠিক পরদিন, অর্থাৎ ২০০৫ সালের ২১ আগস্ট কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল: “ঠান্ডা লড়াইয়ের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে খান চল্লিশেক পারমাণবিক অস্ত্র জোগাড় করেছিল আল-কায়েদা। এর মধ্যে সুটকেস বোমা, পারমাণবিক মাইন ইত্যাদি ছোট বিস্ফোরক আছে। এমনকি ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে। তাদের মোট পারমাণবিক অস্ত্রের অন্তত অর্ধেক চেচেন জঙ্গিদের কাছ থেকে কেনা।”

কিন্তু পিটিআই-এর নামে প্রচারিত এই চাঞ্চল্যকর সংবাদটি নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক ও কৌশলগত বিশ্লেষণের নিরিখে মোটেই সংশয়াতীত নয়। প্রথমত, আল-কায়েদা সংস্থাকে কারা এবং কীভাবে একটি দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী হিসেবে গড়ে তুলেছিল, সেই ঐতিহাসিক তথ্য অনেক আগেই প্রকাশিত এবং বিশ্বজুড়ে সুবিদিত। আশির দশকে সমাজতান্ত্রিক আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও কমিউনিস্ট বিরোধী হামলায় ওসামা বিন লাদেনের আল-কায়েদা এবং মুজাহিদিন গোষ্ঠীকে স্বয়ং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই (পাকিস্তানের মাধ্যমে) সন্ত্রাসী প্রশিক্ষণ ও আধুনিক অস্ত্র সাহায্যে শক্তিশালী করে তুলেছিল। পরবর্তীকালে নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে সেই পুরনো ইতিহাসকেই নতুন করে সাজিয়ে এফবিআই কর্মকর্তারা বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক ছড়াতে প্রচার করেছেন।

দ্বিতীয়ত, ওই প্রতিবেদনের তথ্যের মধ্যে গুরুতর কালানুক্রমিক ও যৌক্তিক অসঙ্গতি রয়েছে। রাশিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী চেচেন জঙ্গিদের হাতে যদি সত্যিই কুড়ি-চল্লিশটি সচল পরমাণু অস্ত্র বা সুটকেস বোমা মজুত থাকত, তবে তারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধে রুশ বা সোভিয়েত শাসকদের বিরুদ্ধে তা ব্যবহার না করে আল-কায়েদার কাছে বিক্রি করতে যাবে কেন—সেই মৌলিক প্রশ্নটি থেকেই যায়। তা ছাড়া ঐতিহাসিক কালানুক্রম দেখলে দেখা যায়, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও ঠান্ডা যুদ্ধের অবসান ঘটে ১৯৯০-৯১ সালের দিকে, আর একটি সংগঠিত আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক হিসেবে আল-কায়েদার পূর্ণাঙ্গ উৎপত্তি ও বিস্তার ঘটে মূলত ১৯৯৪ সালের দিকে বা তার কাছাকাছি সময়ে; ফলে ঠান্ডা লড়াই চলাকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে আল-কায়েদার অস্ত্র কেনার দাবিটি অত্যন্ত দুর্বল। বস্তুত, সন্ত্রাসবাদ দূরীকরণের অজুহাতে আমেরিকা যেভাবে ইরাক ও আফগানিস্তানে সামরিক হামলা চালিয়েছে, তার নৈতিক বৈধতা আদায়ের কৌশল হিসেবেই এ ধরনের প্রচার চালানো হয়েছিল।

তবে মার্কিন গোয়েন্দাদের এই প্রচারে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকলেও, অ-রাষ্ট্রীয় বা সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর হাতে পারমাণবিক উপাদান পৌঁছানোর ঝুঁকিটিকে সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশেষ করে ইউরোপীয় বেসরকারি বহুজাতিক সংস্থা ‘ইউরোপিয়ান ইউরেনিয়াম এনরিচমেন্ট কোম্পানি’ (URENCO) কিংবা মার্কিন বহুজাতিক ‘জেনারেল ইলেকট্রিক কোম্পানি’ (General Electric Company)-এর মতো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে সংবেদনশীল পারমাণবিক প্রযুক্তির সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত এবং মুনাফার কারণে যেভাবে কালোবাজারে প্রযুক্তির আদান-প্রদান ঘটেছে (যেমন আব্দুল কাদের খানের চোরাচালান নেটওয়ার্ক), তাতে বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদী সংস্থার হাতে রেডিওলজিক্যাল বা পারমাণবিক অস্ত্রের উপাদান মজুত থাকার সন্দেহের অবকাশ কিছুটা থেকেই যায়। ঠান্ডা যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বিশ্বে রাসায়নিক, জৈবিক ও পারমাণবিক অস্ত্রের গোপন উৎপাদন এবং সন্ত্রাসবাদের বিস্তার যে মানব সভ্যতার জন্য এক চরম অমঙ্গলজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, তা অনস্বীকার্য।

ভারতের পরমাণু চর্চা (ষষ্ঠ পর্ব) : দেশীয় প্রযুক্তির বিকাশ ও দ্বিতীয় পোখরান পরীক্ষা (১৯৮০–১৯৯৮) -
Tushar Gorai
Nov. 1, 2026 | category | views:1 | likes:0 | share: 0 | comments:0

প্রথম পোখরান বিস্ফোরণের পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বৈদেশিক জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও ভারতের পরমাণু গবেষণা থেমে থাকেনি। আশির দশকের শুরু থেকে নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ পর্যন্ত সময়কালটি ছিল ভারতের পরমাণু ইতিহাসে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তির বিকাশ, পারমাণবিক বিদ্যুৎ চুল্লি নির্মাণে স্বনির্ভরতা অর্জন এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে দ্বিতীয়বার পোখরান বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দেশের সামরিক ও কৌশলগত অবস্থানকে সুদৃঢ় করার এক নির্ণায়ক অধ্যায়।

৬.১ আশির দশকে পরমাণু চর্চার পুনরুজ্জীবন এবং ঠান্ডা যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও সামরিক সমীকরণ

১৯৭৪ সালের প্রথম পোখরান বিস্ফোরণের পর আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার কথা বিবেচনা করে ভারতের পরমাণু কর্মসূচিতে সাময়িকভাবে কিছুটা ঢিলেমি দেখা দিয়েছিল। ১৯৭৮ সালের জুন মাসে ওয়াশিংটনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই জানিয়েছিলেন যে, ভারত পরমাণু প্রসারণ বিরোধী চুক্তিতে (এনপিটি) স্বাক্ষর দেবে এবং দেশের পরমাণু সংস্থাগুলোকে আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থার পরিদর্শনের আওতায় রাখবে। কিন্তু তাঁর সহযোগী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, পরমাণু বিজ্ঞানী এবং প্রযুক্তিবিদদের তীব্র বিরোধিতার কারণে সেই ঘোষণা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হতে পারেনি।

এরপর ১৯৮০ সালে ভারতে পরমাণু চর্চায় পুনরায় নতুন জোয়ার আসে। মার্কিন পক্ষ থেকে ভারতের এই অগ্রগতি নিয়ে যথেষ্ট আশঙ্কা থাকলেও কৌশলগত কারণে সাধারণ মানুষের জ্ঞাতার্থে ভারতের পরমাণু চর্চার এই বিকাশ তখন খুব বেশি প্রচার পায়নি। প্রথম পোখরানের পর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী বিন্দুমাত্র দমে যাননি। দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে তিনি ১৯৮০ সালে রাশিয়ার সাথে ১৬৩ কোটি ডলার মূল্যে সমরাস্ত্র কেনার চুক্তি সম্পাদন করেন।

ভারতের এই স্বাধীন পদক্ষেপের বিপরীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানকে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করার নীতি গ্রহণ করে। ১৯৮১ সালে মার্কিন প্রশাসন পাকিস্তানকে ২৫০ কোটি ডলার মূল্যে যুদ্ধাস্ত্র ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করবে বলে জানায় এবং এর ঠিক তিন মাস পরেই ওই সহায়তার মূল্য বেড়ে প্রায় ৩২০ কোটি ডলারে গিয়ে দাঁড়ায়। শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই নয়, অর্থনৈতিক মঞ্চেও ভারত মার্কিন অসহযোগিতার সম্মুখীন হয়; ভারত যখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে ৫৮০ কোটি ডলার ঋণ চায়, তখন আমেরিকা তার সরাসরি বিরোধিতা করে।

৬.২ তারাপুর জ্বালানি সংকট, মার্কিন শিথিলতা প্রত্যাখ্যান এবং দেশীয় চুল্লির বিস্তার

ক্রমাগত ভারত বিরোধিতার ফলে ভারত প্রবলভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে ঝুঁকছে দেখে শেষ পর্যন্ত মার্কিন কর্মকর্তাদের টনক নড়ে। এই ভূ-রাজনৈতিক দুশ্চিন্তা থেকে তৎকালীন মার্কিন রিগান প্রশাসন ভারতের তারাপুর চুল্লির জ্বালানির বিষয়ে কিছুটা শিথিলতা দেখায় এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শনের পর নিউক্লিয়ার শক্তি বা জ্বালানি সরবরাহ করার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপসহীন ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেই শর্তসাপেক্ষ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।

বৈদেশিক জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কাটাতে ভারত থোরিয়াম ও প্লুটোনিয়ামের অভাবের ফাঁক ভরাট করার প্রচেষ্টা শুরু করে এবং পরমাণু শক্তি চর্চায় বাজেটের খরচ ও কর্মনিয়োগ বাড়িয়ে দেয়। তারাপুর চুল্লির জ্বালানি সংকট মেটাতে ১৯৮২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বদলে ফ্রান্সের সঙ্গে পরমাণু বিষয়ে ভারতের নতুন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

বস্তুত, ড. হোমি ভাবার পরবর্তী সময়ে ভারতে পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের জন্য আর বৈদেশিক সাহায্যের প্রয়োজন হয়নি, কারণ ভারতীয় কারিগর এবং বিজ্ঞানীরা ততদিনে যথেষ্ট দক্ষতা অর্জন করে নিয়েছিলেন। হাতে-কলমে নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ভারতীয় বিজ্ঞানীরা সম্পূর্ণ দেশীয় পারমাণবিক প্রযুক্তি আবিষ্কার করেন এবং নতুন ধরনের ফাস্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টর বা চুল্লি উদ্ভাবনে সক্ষম হন। আশির দশকে ভারতের নিজস্ব পরমাণু প্রকল্পের অধীনে মাদ্রাজের কলপাক্কামে দুটি জল সমন্বিত চুল্লি প্রস্তুত হয়ে যায় এবং ১৯৮৩ ও ১৯৮৫ সালে এই প্রস্তুতি নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীকালে ১৯৯২ ও ১৯৯৩ সালে নারোরা অঞ্চলে একই মাপের আরও দুটি পারমাণবিক চুল্লি নির্মিত হয়। এছাড়াও বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে কাইগাতে দুটি ও রাজস্থানের কোটা অঞ্চলে দুটি চুল্লি নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলে এবং তারাপুর, রাজস্থান, কাইগা ও কুদানকুলামে আরও বারোটি নতুন চুল্লি বসানোর পরিকল্পনা গৃহীত হয়। সামগ্রিকভাবে আশির ও নব্বইয়ের দশকে ভারত পরমাণু শক্তি অর্জনের ক্ষেত্রে পারমাণবিক স্বনির্ভরতায় অনেকটা এগিয়ে আসে, যা পরবর্তীকালে চূড়ান্ত পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানোর সামর্থ্যকে ত্বরান্বিত করে।

৬.৩ সোভিয়েত চুল্লির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান এবং নব্বইয়ের দশকের কূটনৈতিক টানাপোড়েন

আশির দশকে চীনের মতোই ভারতের ক্ষেত্রেও রাশিয়া পরমাণু শক্তির বিকাশ এবং শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর আমলে রাশিয়া ভারতে ৪৪০ মেগাওয়াটের ইউরেনিয়াম চালিত দুটি লাইট ওয়েট রিঅ্যাক্টর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু সেই সময় ভারতের অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের অধিকর্তা ড. রাজা রমান্না রাশিয়ার এই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। ড. রমান্নার সুস্পষ্ট বক্তব্য ছিল যে, ভারতীয় বিজ্ঞানীরা নিজেদের দেশীয় প্রযুক্তির মাধ্যমেই এমন চুল্লি তৈরি করে নিতে পারবেন এবং বৈদেশিক সহায়তা না নিলে ভারতের পরমাণু গবেষণার গোপনীয়তা সম্পূর্ণ বজায় থাকবে।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ঠান্ডা যুদ্ধের অবসানের পর ভারত-মার্কিন সম্পর্কে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়। সামরিক ও পারমাণবিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ১৯৯২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাওয়ের সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং পরবর্তীতে যৌথ সামরিক মহড়াও অনুষ্ঠিত হয়। এই চুক্তির পরেই জানা যায় যে, ভারতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার জন্য আমেরিকা তৎপর হয়েছে এবং ভারতকে সামরিক অস্ত্র বিক্রয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু মার্কিন এই নমনীয়তার আড়ালেও ভারতের নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল; কারণ ভারত যখনই নিজস্ব প্রযুক্তিতে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে চেয়েছে, আমেরিকা তখনই তার তীব্র বিরোধিতা করেছে।

৬.৪ পোখরান-২ (১৯৯৮)-এর নেপথ্য প্রস্তুতি: বিজ্ঞানীদের ভূমিকা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত

পারমাণবিক বিস্ফোরণ এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি রপ্ত করার জন্য ভারতীয় বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ বহুদিন ধরে নিরবচ্ছিন্ন চর্চা চালিয়ে গিয়েছিলেন। এই সাধনার ফলেই তাঁরা কেবল পরমাণু বোমা নয়, বরং পরমাণু বোমা বহনকারী দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্রও নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

১৯৯৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাওয়ের সমর্থনে ভারতে দ্বিতীয়বার পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানোর গোপন প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী রাও এই বিষয়ে বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন ভারতের অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. রাজাগোপাল চিদম্বরম এবং প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থার (ডিফেন্স রিসার্চ) তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তা ও পরবর্তীকালের রাষ্ট্রপতি ড. এপিজে আব্দুল কালামের মাধ্যমে। ড. কালাম ইতিমধ্যেই দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বার্তা দিয়েছিলেন যে, ভারত দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে ব্যাপক অগ্রগতি সাধন করেছে। প্রকাশ্যে পরমাণু অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনা বিষয়ক কোনো বার্তা না দিলেও, দেশের পরমাণু বিজ্ঞানীসহ ড. আব্দুল কালামের পক্ষ থেকে সরকারের ওপর পরমাণু চর্চা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রবল চাপ ছিল।

পরবর্তীকালে নরসিমা রাওয়ের প্রধানমন্ত্রিত্ব চলে যাওয়ার পর কেন্দ্রে অটলবিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বে নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে, সেই সরকারের ওপরেও পরমাণু সংক্রান্ত বিষয়ে মুক্ত জ্ঞান চর্চার পথ খোলা রাখার জন্য যথেষ্ট চাপ ছিল। বাজপেয়ীর সরকার নিজেও পরমাণু বিষয়ে যথেষ্ট তৎপর ছিল। বাস্তবে পারমাণবিক বিস্ফোরণের চূড়ান্ত প্রস্তুতির জন্য অটলবিহারী বাজপেয়ী এবং লালকৃষ্ণ আদবানির সহায়তায় দেশে ‘জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ’ গঠন করা হয়। ঠিক একই সময়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তানও পরীক্ষামূলক পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য পাল্টা প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।

৬.৫ মে ১৯৯৮-এর চূড়ান্ত বিস্ফোরণ, পাকিস্তানের প্রত্যুত্তর এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

সমস্ত গোপন প্রস্তুতি শেষে ১৯৯৮ সালের ১১ মে রাত তিনটে ৪৫ মিনিটে রাজস্থানের পোখরান মরুভূমিতে ভারতের দ্বিতীয়বার পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটানো হয় এবং এর দুদিন বাদে আরও দুটি পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। খুব বড় ধরনের বিস্ফোরণ না হলেও এর প্রবল কম্পনের প্রভাবে পোখরানের কাছাকাছি গ্রামগুলোর বাড়িঘরের দেওয়ালে ফাটল ধরে। রাষ্ট্রীয় ও সামরিক নিরাপত্তার স্বার্থে সমগ্র বিষয়টি অত্যন্ত গোপন রাখা হয়েছিল; বিস্ফোরণ ঘটানোর পরেই দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ীর বাসভবনে সংবাদ দেওয়া হয়। গোপনীয়তার মাত্রা এতটাই কঠোর ছিল যে, দেশের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ভারতের সেনা অধিনায়করাও এই বিস্ফোরণের মাত্র একদিন আগে বিষয়টি জানতে পেরেছিলেন।

পরদিন অত্যন্ত ঘটা করে সংবাদমাধ্যমে এই পারমাণবিক পরীক্ষার খবর ছড়িয়ে পড়ে এবং বিশ্বজুড়ে তীব্র মার্কিন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তবে ভারতের পক্ষ থেকে ড. এপিজে আব্দুল কালাম স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে, ভারত আর নতুন কোনো পরমাণু বিস্ফোরণ করবে না এবং ভারতের পক্ষ থেকে কখনোই পরমাণু অস্ত্রের প্রথম প্রয়োগ করা হবে না।

ভারতের এই পরীক্ষার প্রত্যুত্তরে ১৯৯৮ সালের ২৮ মে বালুচিস্তানের চাঘাই মরুভূমিতে পাকিস্তান পাঁচটি পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটায়। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও পাকিস্তানের এই পাল্টাপাল্টি পরমাণু পরীক্ষার পর ১৯৯৮ সালের ১৮ জুন তৎকালীন মার্কিন ক্লিনটন প্রশাসন একযোগে দুই রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের ওপর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ঘোষণা করে। ভারতের ওপর আরোপিত এই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রধান বিষয়টি ছিল এই যে, এর ফলে ভারত ১১ কোটি ৭০ লক্ষ ডলারের বৈদেশিক ঋণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবে। কিন্তু এই আর্থিক নিষেধাজ্ঞা ভারতের পারমাণবিক স্বনির্ভরতা ও কৌশলগত অবস্থানকে দুর্বল করতে পারেনি।

ভারতের পরমাণু চর্চা (পঞ্চম পর্ব) : প্রথম পোখরান বিস্ফোরণ (১৯৭৪) এবং স্বনির্ভরতার সংগ্রাম (১৯৬৬–১৯৮০) -
Tushar Gorai
Nov. 1, 2026 | category | views:1 | likes:0 | share: 0 | comments:0

ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে সত্তরের দশকের শেষভাগ পর্যন্ত ভারতের পরমাণু কর্মসূচির ইতিহাস ছিল তাত্ত্বিক গবেষণাগার থেকে ব্যবহারিক প্রয়োগে উত্তরণ এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা অর্জনের এক রোমাঞ্চকর অধ্যায়। ১৯৬৪ সালে প্রতিবেশী রাষ্ট্র চীনের পরমাণু বোমা পরীক্ষা এবং ১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা ভারতকে কেবল শান্তিপূর্ণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকতে দেয়নি। জাতীয় নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক কূটনীতিতে নিজেদের সার্বভৌম অবস্থান সুদৃঢ় করার তাগিদে ভারত গোপনে পারমাণবিক বিস্ফোরণ প্রযুক্তির চর্চা শুরু করে, যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৭৪ সালের ১৮ মে রাজস্থানের পোখরান মরুভূমিতে।

৫.১ গোপন প্রস্তুতি, ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্ব এবং ‘পূর্ণিমা’ চুল্লির ভূমিকা

১৯৬৬ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর আকস্মিক মৃত্যুর পর শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব গ্রহণের প্রাথমিক পর্যায়ে শ্রীমতী গান্ধী প্রকাশ্য নীতিগত অবস্থানে পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র বানানোর বিপক্ষে ছিলেন, যার প্রমাণ মেলে ১৯৬৮ সালের ২৮ এপ্রিল লোকসভায় প্রদত্ত তাঁর এক বিবৃতি থেকে। কিন্তু একই সাথে তিনি পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর বৈষম্যমূলক পরমাণু অস্ত্রপ্রসার রোধ চুক্তি বা এনপিটি (NPT) স্বাক্ষরেরও ঘোর বিরোধী ছিলেন। কারণ, ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্রের হাতে ইতিমধ্যেই পরমাণু বোমা মজুত থাকায় ভারতের পক্ষে নিজেদের পরমাণু গবেষণার পথ চিরতরে রুদ্ধ করে দেওয়া সম্ভব ছিল না।

এই কৌশলগত বাস্তবতায় কেবলমাত্র উচ্চতর পারমাণবিক পারদর্শিতা অর্জনের জন্য ভারতে গোপনে পারমাণবিক বিজ্ঞানের বিশেষ চর্চা শুরু হয়। ১৯৬৮ সাল থেকেই প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর শাসনামলে বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ড. রাজাগোপাল চিদম্বরমের নেতৃত্বে পরমাণু বিস্ফোরক তৈরি করার অত্যন্ত গোপন প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং এই বিশেষ প্রকল্পে প্রায় ৭৫ জন দক্ষ ভারতীয় বিজ্ঞানীকে নিযুক্ত করা হয়। উল্লেখ্য, এর আগে ড. হোমি ভাবার প্রয়াণের পর অ্যাটমিক এনার্জি বিভাগের প্রধান হওয়া ড. বিক্রম সারাভাই পরমাণু বোমা বানানোর বিরোধী থাকলেও, অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় অধিকর্তারা জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এই সক্ষমতা অর্জনের পক্ষে ছিলেন। ১৯৭১ সালের শেষভাগ থেকেই ভারতের পক্ষ থেকে শান্তিপূর্ণ পরমাণু বিস্ফোরণ (Peaceful Nuclear Explosion - PNE) ঘটানোর প্রবল ইচ্ছা প্রকাশ পেতে থাকে।

এই গোপন প্রস্তুতির পর্বে ভারতের পারমাণবিক গবেষণার ইতিহাসে একটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য প্রযুক্তিগত মাইলফলক ছিল ‘পূর্ণিমা’ (PURNIMA - Plutonium Reactor for Neutronic Investigations in Multiplying Assemblies) চুল্লি স্থাপন। প্লুটোনিয়াম জ্বালানি ব্যবহার করে দ্রুতগতির নিউট্রন বিভাজন (Fast Neutron Fission) সংক্রান্ত জটিল পদার্থবিদ্যার হিসাব-নিকাশ ও ক্রিটিক্যাল ভরের (Critical Mass) নিখুঁত পরিমাপের জন্য এই গবেষণা চুল্লিটি অপরিহার্য ছিল। কোটার (ও ট্রম্বে কেন্দ্রের) এই পূর্ণিমা চুল্লি স্থাপনের ফলে ভারতীয় বিজ্ঞানীদের হাতে পরমাণু বিস্ফোরণের প্রযুক্তি সম্পর্কিত প্রত্যক্ষ তথ্য ও প্রয়োজনীয় উপাদান তৈরির বাস্তব সুবিধা চলে আসে। বস্তুত, ১৯৭৪ সালে সংঘটিত প্রথম পোখরান বিস্ফোরণের সাফল্যের পেছনে এই পূর্ণিমা চুল্লির প্রযুক্তিগত কার্যকারিতা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

৫.২ ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী এবং ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ

সত্তরের দশকের শুরুতে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) পাকিস্তানি সামরিক জান্তার দমন-পীড়ন এবং ভারতে এক কোটিরও বেশি শরণার্থীর আগমনের প্রেক্ষাপটে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে। ১৯৭১ সালের সেই উত্তাল পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঙ্গার প্রকাশ্যে পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বন করেন এবং ভারতকে সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা চালান। এমনকি যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ভারতকে ভয় দেখাতে মার্কিন সপ্তম নৌবহর (USS Enterprise—যা নিজেই একটি পরমাণু শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী ছিল) বঙ্গোপসাগরে প্রেরণ করা হয়েছিল।

এই সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও মার্কিন সামরিক চাপ আগেভাগেই আঁচ করতে পেরে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এক সুদূরপ্রসারী কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের একটি ঐতিহাসিক দীর্ঘকালীন সহযোগিতা ও বন্ধুত্বের চুক্তি (Indo-Soviet Treaty of Peace, Friendship and Cooperation) স্থাপিত হয়। এই চুক্তির ফলে রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে এবং সামরিক ক্ষেত্রে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রত্যক্ষ সমর্থন ভারতের পক্ষে নিশ্চিত হয়।

অতঃপর ১৯৭১ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে সংঘটিত ভারত-পাক যুদ্ধে ভারতের প্রত্যক্ষ সামরিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সম্পূর্ণ মার্কিন বিরোধিতা উপেক্ষা করে অর্জিত এই ঐতিহাসিক বিজয়ে দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে নিক্সন ও কিসিঙ্গারের কূটনৈতিক খেলায় ছেদ পড়ে যায় এবং বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও উল্লেখযোগ্য স্থান রচিত হয়। কিন্তু যুদ্ধের পর পরাজিত পাকিস্তানকে পুনরায় শক্তিশালী করতে নিক্সনের আমেরিকা পাকিস্তানকে ব্যাপক পরিমাণে সামরিক ও অর্থ সাহায্য করতে শুরু করে। ভারতের সামরিক সম্ভারের সঙ্গে পাকিস্তানের সমতা আনার এই মার্কিন প্রচেষ্টা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ও বিশ্লেষণ পাওয়া যায় প্রখ্যাত কূটনৈতিক বিশ্লেষক ভি. পি. দত্ত (V. P. Dutt) লিখিত ‘ইন্ডিয়াস ফরেন পলিসি’ (India's Foreign Policy) নামক গ্রন্থে।

মার্কিন-পাকিস্তান-চীন অক্ষের এই ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারত পরমাণু বোমা বা বিস্ফোরক তৈরির জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করে। ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের ঠিক পরেই, ১৯৭২ সালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ভারতীয় বিজ্ঞানীদের পরীক্ষামূলক পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানোর প্রয়াসে চূড়ান্ত অনুমোদন ও সায় প্রদান করেন।

৫.৩ পোখরান-১ (১৮ মে ১৯৭৪): ‘বুদ্ধ হাসছেন’ ও পরমাণু মানচিত্রে ভারতের উত্থান

প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সবুজ সংকেত পাওয়ার পর ভারতের অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. হোমি এন. শেঠনা, ভাবা অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টারের (BARC) অধিকর্তা ড. রাজা রমান্না এবং ড. রাজাগোপাল চিদম্বরমের মতো শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানীদের তত্ত্বাবধানে অত্যন্ত গোপনে পরীক্ষার প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়। কানাডার সহায়তায় নির্মিত ট্রম্বের ‘সাইরাস’ (CIRUS) চুল্লি থেকে প্রাপ্ত প্লুটোনিয়াম-২৩৯ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি করা হয় একটি জটিল ‘ইমপ্লোশন’ (Implosion) ঘরানার পারমাণবিক ডিভাইস।

অবশেষে আসে সেই ঐতিহাসিক দিন—১৯৭৪ সালের ১৮ মে (বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন)। রাজস্থানের থর মরুভূমির অন্তর্গত পোখরান সেনা ছাউনির লুহুরকি গ্রামের কাছে মাটির নিচে (ভূ-গর্ভে) ভোর আটটা পাঁচ মিনিটে ঘটানো হয় ভারতের প্রথম পরীক্ষামূলক পারমাণবিক বিস্ফোরণ। সাংকেতিকভাবে ‘স্মাইলিং বুদ্ধ’ (Smiling Buddha) বা ‘বুদ্ধ হাসছেন’ নামে পরিচিত এই বিস্ফোরণটির ক্ষমতা ছিল প্রায় ১২ কিলোটন টিএনটি (TNT)-এর সমতুল্য, যা মরুভূমির বুকে এক প্রবল ঝড়ের ধাক্কার সমান কম্পন সৃষ্টি করেছিল।

গোপন গবেষণার মাধ্যমে পোখরানে ঘটানো এই সফল বিস্ফোরণ বিশ্ববাসীকে চমকে দেয়। রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও চীন—অর্থাৎ তথাকথিত নিউক্লিয়ার ক্লাব) বাইরে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ভারত পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটানোর সক্ষমতা অর্জন করে। ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এই পরীক্ষাকে সামরিক অস্ত্র পরীক্ষা না বলে ‘শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক বিস্ফোরণ’ (Peaceful Nuclear Explosion) হিসেবে ঘোষণা করে।

৫.৪ আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, মার্কিন প্রতিক্রিয়া ও কূটনৈতিক অস্থিরতা

পোখরানের এই পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণের সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ও বেসরকারি মহলে তুমুল সমালোচনার ঝড় ওঠে। ভারতের প্রথম পোখরান বিস্ফোরণের সময় আমেরিকার এই তীব্র নিষেধাজ্ঞা ও ক্ষোভের মূল কারণ ছিল বিশ্বে নিজেদের একচেটিয়া আধিপত্য বা একমেরু বিশ্ব ব্যবস্থা বজায় রাখার মানসিকতা। আমেরিকা নতুন পরমাণু আইন তৈরি করে, যার দ্বারা তারা অসহযোগিতার সিদ্ধান্ত নেয় কারণ ভারত পরীক্ষামূলকভাবে পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। এমনকি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মঞ্চে ভারতকে শায়েস্তা করার জন্য প্রস্তাব তোলা হয় যে, যে সমস্ত দেশ এনপিটি (NPT) চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি, তাদের বিশ্বব্যাংক (World Bank) থেকে কোনো ঋণ দেওয়া হবে না—যে প্রস্তাবের মূল লক্ষ্যবস্তুই ছিল ভারত।

সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে ভারতের পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহের ওপর। ১৯৬৩ ও ১৯৬৬ সালের ভারত-আমেরিকা চুক্তি অনুযায়ী মহারাষ্ট্রের তারাপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুল্লি দুটির জন্য আমেরিকা থেকে ভারতে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জ্বালানি পাঠানোর ব্যবস্থা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত চুক্তি অনুযায়ী যতটা ইউরেনিয়াম ভারত পাওয়ার কথা ছিল, বাস্তবে তা আসেনি। পোখরানের বিস্ফোরণের পর শাস্তিস্বরূপ মার্কিন পারমাণবিক শক্তি কমিশনের তরফ থেকে ভারতের অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের চেয়ারম্যান ড. হোমি শেঠনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, ভারতকে আর কোনো ইউরেনিয়াম জ্বালানি পাঠানো হবে না।

অন্যান্য পাশ্চাত্য ও মিত্র দেশগুলোও ভারতের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। পোখরানের ঘটনার পর জাপান ও ব্রিটেন ভারতকে প্রদেয় আর্থিক সহায়তা বন্ধ করে দেয়। অন্যদিকে, কানাডা (যাদের সহযোগিতায় সাইরাস ও রাওয়াতভাটা চুল্লি নির্মিত হয়েছিল) অভিযোগ তোলে যে তাদের দেওয়া শান্তিপূর্ণ গবেষণার চুল্লি থেকে প্রাপ্ত প্লুটোনিয়াম ভারত বিস্ফোরণে ব্যবহার করেছে, এবং এর জেরে কানাডা ভারতকে যে পরমাণু সংক্রান্ত কারিগরি সাহায্য দিচ্ছিল তা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়াও ভারতের এই পরীক্ষার প্রতিক্রিয়াতেই ১৯৭৪ সালে মার্কিন নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপ’ (NSG), যার মাধ্যমে এনপিটি-বহির্ভূত দেশগুলোতে যেকোনো পারমাণবিক প্রযুক্তি ও জ্বালানি রপ্তানি নিষিদ্ধ করা হয়।

১৯৭৪ সালের অক্টোবর মাসে মার্কিন পররাষ্ট্রসচিব হেনরি কিসিঙ্গার ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হন। ভারতে পৌঁছে নিজের সম্পর্কে ভারতীয় পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত সমালোচনামূলক প্রতিবেদনগুলো পড়ে তিনি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং নয়াদিল্লির ‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স’ (Indian Council of World Affairs)-এর সভায় তাঁর সেই ক্ষোভ প্রকাশ্যেই উগরে দিয়েছিলেন। দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করার পরও তিনি তিন দিন দিল্লিতে অবস্থান করেন। কিন্তু ভারতের স্বাধীন পরমাণু নীতি পরিবর্তন করতে ব্যর্থ হয়ে মার্কিন ক্রোধ আরও বৃদ্ধি পায় এবং কিসিঙ্গার ভারত থেকে ফিরেই পাকিস্তানকে নতুন সামরিক সাহায্যের বন্দোবস্ত করে দিয়ে আসেন। একই সাথে ভারতকে টেক্কা দিতে ফ্রান্সের সাহায্যে পাকিস্তানে একটি প্লুটোনিয়াম পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ চুল্লি (Plutonium Reprocessing Plant) স্থাপনের ব্যবস্থাও তখন করা হয়। এর আগে ১৯৭১ সালের যুদ্ধে পরাজয়ের পর থেকেই পাকিস্তান পরমাণু বোমা বানানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল এবং এই কাজে আমেরিকা ও ফ্রান্স পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের পরিকাঠামো তৈরিতে এগিয়ে আসে।

৫.৫ প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা অর্জন, ‘ধ্রুব’ চুল্লি এবং সত্তরের দশকের শেষভাগের পরিস্থিতি

বিদেশ থেকে প্রাপ্য সমস্ত পারমাণবিক সহযোগিতার পথ রাতারাতি বন্ধ হয়ে গেলেও ভারত কিন্তু খুব বেশি বিপন্ন হয়নি। কারণ, ড. হোমি ভাবা এবং ড. মেঘনাদ সাহার প্রদর্শিত পথে চলে ভারত ইতিমধ্যেই পরমাণু চর্চায় অনেক বেশি অভ্যন্তরীণ স্বনির্ভরতা লাভ করেছিল। পোখরানের এই ঐতিহাসিক সাফল্য ভারতীয় বিজ্ঞানীদের মনোবল, সাহস ও আত্মনির্ভরতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউরেনিয়াম সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভারত ১৯৭৫ সালেই মুম্বাইয়ের ট্রম্বেতে সম্পূর্ণ দেশীয় নকশায় ‘ধ্রুব’ (Dhruva) নামক একটি বৃহৎ গবেষণাধর্মী পরমাণু চুল্লির নির্মাণকাজ শুরু করে। ভারতের নিজস্ব খনিতে উচ্চমাত্রার পরিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম-২৩৫ পর্যাপ্ত পরিমাণে না থাকলেও, ভারতীয় বিজ্ঞানীরা কৌশল গ্রহণ করেন যে প্রাকৃতিক ইউরেনিয়াম ও দেশের বিপুল থোরিয়াম-২৩২ সম্পদের সাথে এক বিশেষ নিউক্লীয় সংযোজন ও রূপান্তর ক্রিয়ায় (Neutron Absorption and Beta Decay) এই ‘ধ্রুব’ চুল্লি থেকে বিশেষ জাতের কৃত্রিম ফিসাইল জ্বালানি ইউরেনিয়াম-২৩৩ এবং উচ্চমানের প্লুটোনিয়াম উৎপাদিত হবে। সুতরাং, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম না পাওয়া গেলেও ভারতের পরমাণু গবেষণা ও প্রতিরক্ষা কর্মসূচি যে বিশেষ কোনো অসুবিধার মধ্যে পড়বে না, তা নিশ্চিত হয়ে যায়।

তবে পোখরানে পরীক্ষামূলক পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটানোর পর তীব্র আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কথা মাথায় রেখে সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের প্রকাশ্য পরমাণু অস্ত্র চর্চায় কিছুটা কৌশলগত ঢিলেমি লক্ষ্য করা যায়। যদিও দেশের পরমাণু বিজ্ঞানীরা গবেষণার কাজে প্রবলভাবে উৎসাহী হয়ে উঠেছিলেন এবং ভারতের সামরিক কর্মকর্তারাও জাতীয় সুরক্ষার স্বার্থে আরও শক্তিশালী পরমাণু বোমা (থার্মোনিউক্লিয়ার বা হাইড্রোজেন বোমা) তৈরির পক্ষপাতী ছিলেন। অন্যদিকে, পরমাণু বিজ্ঞানের মৌলিক চর্চায় ভারত যথেষ্ট উন্নতি করলেও এই পর্বে পরমাণু থেকে বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদন আশানুরূপ বাড়ানো সম্ভব হচ্ছিল না। কারণ, পরমাণু চুল্লি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রাথমিক পরিকাঠামোগত খরচ ছিল অত্যন্ত বেশি এবং ভারতের তৎকালীন যোজনা কমিশনের (Planning Commission) কাছ থেকে এই খাতে প্রয়োজনীয় বাড়তি অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছিল না।

১৯৭৭ সালে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পালাবদল ঘটে এবং ইন্দিরা গান্ধীর পর জনতা পার্টির সরকার গঠিত হলে মোরারজি দেশাই প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৭৮ সালের জুন মাসে ওয়াশিংটন সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই জানিয়েছিলেন যে, ভারত কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না, এমনকি শান্তিপূর্ণ বিস্ফোরণও ঘটাবে না; এবং তিনি ইঙ্গিত দেন যে ভারত পরমাণু প্রসারণ বিরোধী চুক্তিতে (NPT) স্বাক্ষর দেবে ও দেশের পরমাণু সংস্থাগুলোকে আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থার (IAEA) সর্বাত্মক পরিদর্শনের মধ্যে রাখবে। কিন্তু দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার পরিপন্থী এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তাঁরই মন্ত্রিসভার সহযোগী নেতৃবৃন্দ, পরমাণু বিজ্ঞানী এবং প্রযুক্তিবিদরা তীব্র বিরোধিতা করেন, যার ফলে দেশাইয়ের সেই প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।

অতঃপর ১৯৮০ সালে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী পুনরায় ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন করলে ভারতে পরমাণু চর্চা ও গবেষণায় আবার নতুন করে জোয়ার আসে। মার্কিন পক্ষ থেকে ভারতের এই পুনরুজ্জীবিত পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে গভীর আশঙ্কা থাকলেও, কৌশলগত কারণেই আশির দশকের শুরুতে ভারতের পরমাণু চর্চার এই অগ্রগতি সাধারণ মানুষের জ্ঞাতার্থে বা সংবাদমাধ্যমে খুব বেশি প্রচার পায়নি; বরং নিভৃতেই ভারত তার পরবর্তী প্রজন্মের দেশীয় চুল্লি ও ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণের পথে এগিয়ে যেতে থাকে।

ভারতের পরমাণু চর্চা (চতুর্থ পর্ব) : আন্তর্জাতিক পরমাণু চুক্তির রাজনীতি ও ভারতের সার্বভৌম অবস্থান -
Tushar Gorai
Nov. 1, 2026 | category | views:1 | likes:0 | share: 0 | comments:0

বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশক থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পরমাণু রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল বিভিন্ন পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ চুক্তি প্রণয়ন এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের ওপর তা চাপিয়ে দেওয়ার কূটনৈতিক কৌশল। একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষি উন্নয়ন এবং চিকিৎসাক্ষেত্রে পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার অব্যাহত থাকলেও, অন্যদিকে নিজেদের দেশের আত্মরক্ষার তাগিদে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে পরমাণু যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণের প্রচেষ্টা ক্রমশ তীব্র হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে আমেরিকা, সোভিয়েত রাশিয়া, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মতো পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার অক্ষুণ্ণ রেখে বিশ্বের অন্যান্য দেশের পরমাণু কর্মসূচিকে আইনি বাধায় শৃঙ্খলিত করতে একের পর এক আন্তর্জাতিক চুক্তির অবতারণা করে। আংশিক পরমাণু নিষিদ্ধকরণ চুক্তি (PTBT), পরমাণু অস্ত্রপ্রসার রোধ চুক্তি (NPT) এবং সার্বিক পরমাণু পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ চুক্তি (CTBT)-কে ঘিরে আবর্তিত এই বৈষম্যমূলক রাজনীতির বিরুদ্ধে ভারতের সার্বভৌম অবস্থান দেশের বিজ্ঞান ও প্রতিরক্ষা ইতিহাসের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

৪.১ আংশিক পরমাণু নিষিদ্ধকরণ চুক্তি (PTBT) এবং ভূ-গর্ভস্থ পরীক্ষার বৈজ্ঞানিক বিতর্ক

১৯৬৩ সালে মহারাষ্ট্রের তারাপুরে ভারতের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ চুল্লি নির্মাণের কাজ শুরু হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ভবিষ্যৎ পরমাণু সক্ষমতা নিয়ে ভেতরে ভেতরে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সোভিয়েত রাশিয়া, ফ্রান্স এবং ব্রিটেনের মতো বিশ্বের অন্যান্য পরমাণু শক্তিধর দেশগুলো একের পর এক পরীক্ষামূলক পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানোর ফলে বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহল প্রবলভাবে তেতে ওঠে। ক্রমবর্ধমান এই পারমাণবিক প্রতিযোগিতা ও পরিবেশগত ঝুঁকির প্রেক্ষাপটে এমন একটি আন্তর্জাতিক আইন নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, যার প্রাথমিক ও ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ রোধ করার মাধ্যমে নতুন করে পরমাণু বোমা তৈরি এড়ানো।

এই আন্তর্জাতিক উদ্যোগের ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্রসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে তৈরি হয় ‘আংশিক পরমাণু নিষিদ্ধকরণ চুক্তি’ বা পার্শিয়াল টেস্ট ব্যান ট্রিটি (Partial Test Ban Treaty), যা সংক্ষেপে ‘পিটিবিটি’ (PTBT) নামে পরিচিত। রাষ্ট্রসঙ্ঘের অধিকাংশ সদস্য রাষ্ট্রই পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষার সার্বিক নিষিদ্ধকরণ চেয়েছিল। কিন্তু পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত স্বার্থে এবং বিশ্ব জনমানসে পরিবেশ রক্ষার সমর্থনের জোয়ারে শেষ পর্যন্ত বায়ুমণ্ডল বা প্রকাশ্য স্থানের পরিবর্তে কেবল মাটির নিচে পরীক্ষামূলক পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানোর প্রস্তাবটি গৃহীত হয়।

মাটির নিচে বা ভূ-গর্ভে পরমাণু বিস্ফোরণের সপক্ষে তৎকালীন প্রভাবশালী বিজ্ঞানীদের একাংশ যুক্তি দিয়েছিলেন যে, মাটির গভীরে বোমা ফাটালে তার থেকে উৎপন্ন মারাত্মক তেজস্ক্রিয় বিকিরণ (Radioactive radiation) বাইরে বা বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়বে না। কিন্তু পরবর্তীকালে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, বিজ্ঞানীদের সেই আশ্বাস সম্পূর্ণ সঠিক ছিল না এবং মাটির নিচে ঘটানো বিস্ফোরণ থেকেও পরিবেশে বিপজ্জনক মাত্রায় তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ছড়িয়েছে। ভূ-গর্ভস্থ পারমাণবিক বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট এই তেজস্ক্রিয় দূষণ এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিতর্কের বিষয়ে বিস্তৃত ও প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায় গ্রেস এম. ফারেরা (Grace M. Ferrara) সম্পাদিত বিখ্যাত সংকলন গ্রন্থ ‘অ্যাটমিক এনার্জি অ্যান্ড দ্য সেফটি কন্ট্রোভার্সি’ (Atomic Energy and the Safety Controversy) পুস্তকে। সর্বোপরি, বায়ুমণ্ডলে পরীক্ষা বন্ধ হলেও মাটির নিচে বিস্ফোরণের পথ খোলা থাকায় এই আংশিক চুক্তির (PTBT) ফলে বিশ্বজুড়ে পরমাণু অস্ত্রের প্রসার বিন্দুমাত্র রোধ করা যায়নি।

৪.২ পরমাণু অস্ত্রপ্রসার রোধ চুক্তি (NPT) এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণী দ্বন্দ্ব

আংশিক পরমাণু নিষিদ্ধকরণ চুক্তির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠার পর, ১৯৬৮ সালে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে চালু হয় ‘পরমাণু অস্ত্রপ্রসার রোধ চুক্তি’ বা নন-প্রলিফারেশন ট্রিটি (Non-Proliferation Treaty), যা সংক্ষেপে ‘এনপিটি’ (NPT) নামে পরিচিত। পরবর্তী সময়ে মার্কিন রাষ্ট্রপতি জর্জ বুশের আমলেও বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর সংগ্রহের জন্য ব্যাপক কূটনৈতিক অভিযান চালানো হয়। কিন্তু এই চুক্তির কাঠামোটি শুরু থেকেই ছিল চরম বৈষম্যমূলক, কারণ এতে নির্ধারিত গুটিকয়েক পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রের বাইরে অন্য কোনো দেশের পরমাণু অস্ত্রের অধিকারকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এই বৈষম্য ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে ভারত, পাকিস্তান এবং চীন (প্রাথমিক পর্যায়ে) এই এনপিটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি।

১৯৬৮ সালে ভারত কেন এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে পারে না, তার কৌশলগত কারণ ব্যাখ্যা করে ভারতের তৎকালীন স্বরাষ্ট্র সচিবের একটি লিখিত বিবৃতি সংসদে বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছিল। ওই বিবৃতিতে স্পষ্ট জানানো হয় যে, ভারত কোনোভাবেই এমন একতরফা পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে পারে না, কারণ ভারতের ঠিক পাশেই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের (চীনের, যারা ১৯৬৪ সালে প্রথম বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল) হাতে ইতিমধ্যেই পরমাণু বোমা মজুত রয়েছে। উল্লেখ্য যে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের পরমাণু সক্ষমতা এবং ভারতের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ঝুঁকির এই বিষয়টি নিয়ে বিজ্ঞানী ড. হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা তাঁর জীবদ্দশায় প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুকে বারবার সচেতন করেছিলেন।

তবে ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের রাজনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক মহলের অন্দরে পরমাণু বোমা তৈরি করা উচিত কি না, তা নিয়ে তীব্র মতপার্থক্য ও নৈতিক দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। ১৯৬৬ সালে বিজ্ঞানী হোমি ভাবার আকস্মিক মৃত্যুর পর ভারতের অ্যাটমিক এনার্জি বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ড. বিক্রম সারাভাই। ড. সারাভাই ব্যক্তিগত ও নীতিগতভাবে পরমাণু বোমা বানানোর ঘোর বিরোধী ছিলেন এবং পরমাণু শক্তিকে কেবল উন্নয়নমূলক কাজে সীমাবদ্ধ রাখার পক্ষপাতী ছিলেন। একইভাবে, পণ্ডিত নেহরুর পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীও কখনো সামরিক উদ্দেশ্যে পরমাণু বোমা বানানোর পক্ষে ছিলেন না; তবে তিনি দেশের উন্নয়ন ও গবেষণার স্বার্থে শান্তিপূর্ণ কাজের জন্য পরমাণু বিস্ফোরণ (Peaceful Nuclear Explosion) ঘটানোর প্রস্তাবে সহমত প্রদান করেছিলেন।

কিন্তু ড. বিক্রম সারাভাইয়ের আপত্তি সত্ত্বেও ভারতের অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় অধিকর্তারা ও বিজ্ঞানীরা জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে পরমাণু বোমা বানানোর পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন। ১৯৬৬ সালে প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর প্রয়াণের পর শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৬৮ সালের ২৮ এপ্রিল লোকসভায় প্রদত্ত এক বিবৃতি থেকে জানা যায় যে, প্রকাশ্য নীতিগত অবস্থানে শ্রীমতী গান্ধীও প্রথমে পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র বানানোর বিপক্ষে ছিলেন; কিন্তু ভারতের সার্বভৌমত্ব ও কৌশলগত স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি বৈষম্যমূলক এনপিটি (NPT) চুক্তি স্বাক্ষরেরও তীব্র বিরোধী ছিলেন।

বস্তুত, পরমাণু চর্চায় রত যেকোনো দেশের মধ্যেই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে পরমাণু বোমা বানানোর একটি স্বাভাবিক প্রবণতা কাজ করে। তাই প্রকাশ্য কূটনৈতিক স্তরে শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের কথা বলা হলেও, কেবলমাত্র উচ্চতর পারমাণবিক পারদর্শিতা অর্জনের জন্য ভারতে গোপনে পারমাণবিক বিজ্ঞানের কৌশলগত চর্চা শুরু হয়। ১৯৬৮ সাল থেকেই প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর শাসনামলে বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ড. রাজাগোপাল চিদম্বরমের নেতৃত্বে পরমাণু বোমা বা বিস্ফোরক তৈরি করার অত্যন্ত গোপন প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং এই বিশেষ গবেষণাকর্মে প্রায় ৭৫ জন দক্ষ ভারতীয় বিজ্ঞানী নিযুক্ত হন।

পরবর্তীকালে ১৯৭৪ সালে পোখরানে ভারতের প্রথম পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণের পর আন্তর্জাতিক চাপ বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। ১৯৭৮ সালের জুন মাসে ওয়াশিংটন সফরকালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই এক বিতর্কিত বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন যে, ভারত পরমাণু প্রসারণ বিরোধী চুক্তিতে (NPT) স্বাক্ষর দেবে এবং ভারতের সমস্ত পরমাণু সংস্থাগুলোকে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) পরিদর্শনের অধীনে রাখবে। কিন্তু মোরারজি দেশাইয়ের এই ব্যক্তিগত নমনীয় মনোভাব দেশের অভ্যন্তরে তীব্র বাধার সম্মুখীন হয় এবং তাঁর সহযোগী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, পরমাণু বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের প্রবল বিরোধিতায় শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি।

৪.৩ সার্বিক পরমাণু পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ চুক্তি (CTBT) এবং ‘সাব-ক্রিটিক্যাল টেস্ট’-এর রাজনীতি

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পিটিবিটি (PTBT) এবং এনপিটি (NPT)—উভয় চুক্তিরই চরম ব্যর্থতা লক্ষ্য করার পর, নব্বইয়ের দশকে পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর উদ্যোগে একটি নতুন চুক্তি তৈরি করা হয়। ১৯৯৬ সালের ১০ জানুয়ারি প্রণীত এই নতুন চুক্তিটির নাম দেওয়া হয় ‘সার্বিক পরমাণু পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ চুক্তি’ বা কমপ্রিহেনসিভ টেস্ট ব্যান ট্রিটি (Comprehensive Test Ban Treaty - CTBT)। কাগজে-কলমে এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হিসেবে সার্বিক পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ এবং বিশ্বজুড়ে যেকোনো ধরনের পরীক্ষামূলক পারমাণবিক বিস্ফোরণ চিরতরে রোধ করার প্রচেষ্টার কথা প্রচার করা হয়।

কিন্তু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সিটিবিটি চুক্তির আসল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বের যে সমস্ত রাষ্ট্র তখনো পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী নয়, তাদের নতুন করে অস্ত্র তৈরি ও পরীক্ষার পথ চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া। কারণ, প্রযুক্তিগত দিক থেকে এই চুক্তির নিষেধাজ্ঞাগুলো আমেরিকা, রাশিয়া, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মতো উন্নত পরমাণু শক্তিধর দেশগুলোর ক্ষেত্রে কার্যত প্রযোজ্য বা বাধাস্বরূপ ছিল না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই প্রথম বিস্ফোরণ ঘটানোর পর থেকে শুরু করে পরবর্তী দশকগুলোতে বহুবার বাস্তব পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বিপুল তথ্যভাণ্ডার সংগ্রহ করে রেখেছিল। নব্বইয়ের দশকে কম্পিউটার প্রযুক্তিতে প্রভূত উন্নয়ন হওয়ার ফলে এই উন্নত দেশগুলোর হাতে আসে কম্পিউটার সিমুলেশন পদ্ধতিতে পারমাণবিক বিস্ফোরণের পরীক্ষা করার অত্যাধুনিক সুযোগ।

মাটির নিচে বা বায়ুমণ্ডলে কোনো প্রকৃত চেইন রিঅ্যাকশন বা পূর্ণাঙ্গ বিস্ফোরণ না ঘটিয়ে গবেষণাগারে কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে পরিচালিত এই পরীক্ষাকে বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় বলা হয় ‘সাব-ক্রিটিক্যাল টেস্ট’ (Sub-critical test)। সিটিবিটি চুক্তিতে প্রচলিত বিস্ফোরণ নিষিদ্ধ করা হলেও উন্নত দেশগুলোর এই ‘সাব-ক্রিটিক্যাল টেস্ট’ নিষিদ্ধ করা হয়নি, ফলে তারা চুক্তির মধ্যে থেকেও নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার আধুনিকীকরণ করতে পারত। উপরন্তু, সিটিবিটি চুক্তির বিধানে এমন কঠোর শর্ত রাখা হয়েছিল যে, যে সমস্ত দেশ এই চুক্তি অনুমোদন করবে না, তাদের ওপর আন্তর্জাতিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিশ্বকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার মহৎ উদ্দেশ্যের কথা বলে এই চুক্তি করা হলেও, যারা গোড়া থেকেই বিপুল পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী বা পরমাণু শক্তিধর, তাদের অস্ত্রভাণ্ডার ধ্বংস করা বা তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো অনুরূপ কথা এই চুক্তিতে বলা ছিল না।

৪.৪ পরমাণু বৈষম্য ও নিরস্ত্রীকরণের প্রশ্নে ভারতের সার্বভৌম অবস্থান

এনপিটি এবং সিটিবিটি—উভয় চুক্তিতেই স্বাক্ষর দেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক মহল, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে ভারতের ওপর ধারাবাহিকভাবে প্রবল কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। প্রথম পোখরান বিস্ফোরণের পর যে সমস্ত দেশ এনপিটি-তে স্বাক্ষর করেনি, তাদের বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ না দেওয়ার প্রস্তাব তোলা হয়েছিল, যার মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল ভারত। আবার আন্তর্জাতিক বিধি অনুযায়ী ভারত এনপিটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি বলে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) নির্দিষ্ট নীতি-নির্ধারণী স্তরে কোনো ভারতীয় সদস্য দীর্ঘকাল স্থান পাননি। এমনকি ২০০৫ সালে ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তির সময়ও ভারত এনপিটি-তে স্বাক্ষর না করায় ব্রিটেন ওই দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বিরোধিতা করেছিল। আমেরিকার অভ্যন্তরীণ আইন অনুযায়ীও চার-পাঁচটি স্বীকৃত রাষ্ট্র (নিউক্লিয়ার ক্লাব) ছাড়া পারমাণবিক শক্তির সামগ্রিক ব্যবহার (সামরিক ও অসামরিক) অন্য কেউ করতে পারবে না, এবং এনপিটি-বহির্ভূত দেশ হওয়ায় ভারত পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র হয়েও আন্তর্জাতিক স্তরে সহজে কোনো সুযোগ-সুবিধা পাবে না বলে বারবার চাপ দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু এই সমস্ত আন্তর্জাতিক রক্তচক্ষু ও নিষেধাজ্ঞার ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে ভারত তার সার্বভৌম অবস্থানে অবিচল থেকেছে। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক মহল থেকে যতই চাপ আসুক না কেন, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের স্বার্থে ভারত এই বৈষম্যমূলক চুক্তিতে (NPT/CTBT) কখনোই স্বাক্ষর করবে না। অন্যদিকে ভারতের দায়িত্বশীল পরমাণু নীতির কথা স্পষ্ট করে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ও বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. এপিজে আব্দুল কালাম (১৯৯৮-এর দ্বিতীয় পোখরান পরীক্ষার পর) বিশ্ববাসীকে জানিয়েছিলেন যে, ভারত স্বেচ্ছায় আর নতুন কোনো পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটাবে না (Voluntary moratorium) এবং ভারত কখনোই কোনো দেশের বিরুদ্ধে পরমাণু অস্ত্রের প্রথম প্রয়োগ (No First Use) করবে না।

পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের প্রশ্নে ভারতের রাষ্ট্রীয় অবস্থান অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণ ও সুস্পষ্ট। ভারতের দাবি হলো, নিজেদের হাতে থাকা নিজস্ব ও দেশীয় পরমাণু প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আত্মরক্ষার্থে অস্ত্র তৈরি করে মজুত করতে ভারতের কোনো আপত্তি নেই এবং এতে কারো হস্তক্ষেপ ভারত মানবে না। ভারত স্পষ্টভাবে শর্ত দিয়েছে যে, বিশ্বের বর্তমান পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো যদি বৈষম্য ত্যাগ করে তাদের ভাণ্ডারে সঞ্চিত সমস্ত পরমাণু বোমা সম্পূর্ণভাবে বিনষ্ট করে, তবেই কেবল ভারত পরমাণু প্রসারণ বিরোধী চুক্তি (NPT) এবং সার্বিক পরমাণু পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ চুক্তিতে (CTBT) স্বাক্ষর প্রদান করবে।

ভারতের পরমাণু চর্চা (তৃতীয় পর্ব ) : পরমাণু কূটনীতি, ‘অ্যাটমস ফর পিস’ এবং ভারতের প্রাথমিক চুল্লি নির্মাণ (১৯৫৩–১৯৬৩) -
Tushar Gorai
Nov. 1, 2026 | category | views:1 | likes:0 | share: 0 | comments:0

ভারতের অভ্যন্তরে পরমাণু গবেষণার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপনের সমান্তরালে পঞ্চাশের দশকের শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক পরমাণু কূটনীতির জটিল আবর্তে ভারতকে জড়িয়ে পড়তে হয়েছিল। ভারত প্রাথমিকভাবে পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের পক্ষে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকলেও, ঠান্ডা যুদ্ধের মেরুকরণের কারণে ভারতীয় রাষ্ট্রনেতা এবং বিজ্ঞানীরা অচিরেই আন্তর্জাতিক বিবাদের সম্মুখীন হন। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও কানাডা এবং অন্যদিকে সোভিয়েত রাশিয়া ও চীনকে নিয়ে গঠিত পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর তথাকথিত ‘নিউক্লিয়ার ক্লাব’ বিশ্বের পারমাণবিক সম্পদ ও প্রযুক্তির ওপর নিজেদের একচেটিয়া আধিপত্য বজায় রাখতে সচেষ্ট ছিল। ১৯৫৩ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত সময়কালটি ছিল এই আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ভারতের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং বৈদেশিক সহযোগিতা ও দেশীয় দক্ষতার সমন্বয়ে দেশের প্রথম পর্যায়ের পারমাণবিক চুল্লিগুলো নির্মাণের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

৩.১ থোরিয়াম বিতর্ক, মার্কিন চাপ এবং ভারতের সার্বভৌম অবস্থান (১৯৫৩)

১৯৫৩ সালে ভারতের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও, পরমাণু শক্তির ক্ষেত্রে ভারতের স্বাধীন ও সার্বভৌম উদ্যোগকে প্রথম থেকেই আমেরিকা বাধা দিতে শুরু করে। এই কূটনৈতিক সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে ১৯৫৩ সালে ভারত থেকে চীনে ২ টন থোরিয়াম নাইট্রেট পাঠানোকে কেন্দ্র করে। তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন পরমাণু শক্তির প্রসার রোধ ও কমিউনিস্ট ব্লককে কোণঠাসা করার লক্ষ্যে একটি কঠোর পারমাণবিক আইন প্রণয়ন করেছিল, যেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছিল যে সোভিয়েত রাশিয়ার সাথে সম্পর্কিত বা তাদের মিত্র কোনো দেশের সাথে পারমাণবিক যেকোনো লেনদেন করলে সংশ্লিষ্ট দেশকে আমেরিকা কোনো আর্থিক এবং সামরিক সহায়তা প্রদান করবে না। এই আইনের দোহাই দিয়ে ভারত থেকে চীনে থোরিয়াম নাইট্রেট পাঠানোর অপরাধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে আর্থিক সহায়তা না করার কড়া বার্তা দেয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা হুমকির বিরুদ্ধে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে জবাব দেন যে, ভারত তার সার্বভৌম অধিকার কখনোই ক্ষুণ্ণ হতে দেবে না। পণ্ডিত নেহরু দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্পষ্ট করে দেন যে, মার্কিন রাষ্ট্রনীতি অনুযায়ী ভারত পরিচালিত হয় না এবং বৈদেশিক আর্থিক সহায়তা পাওয়ার বিনিময়ে ভারত কখনোই তার নিজস্ব স্বাধীন রাষ্ট্রীয় নীতি বিসর্জন দেবে না। সদ্য স্বাধীন একটি উন্নয়নশীল দেশের প্রধানমন্ত্রীর এই অনড় এবং কঠোর মানসিকতা সেদিন মার্কিন প্রশাসনের কাছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল।

ভারতের এই আপসহীন অবস্থানের মুখে কৌশল পরিবর্তন করে আমেরিকা ভারতের সমস্ত থোরিয়াম কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু থোরিয়াম নাইট্রেটের সেই ঘটনাটি ইতিহাসের পাতায় স্থান নিলেও, ভারতের এই স্বাধীনচেতা মনোভাবের কারণে আমেরিকা পাকিস্তানকে ভারতের বিরুদ্ধতায় কাজে লাগাতে উদ্যত হয়। তৎকালীন ভূ-রাজনীতিতে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয়—একদিকে চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে ব্যবহার করার মার্কিন বাসনা প্রবল ছিল এবং চীনের বিরোধিতায় ভারতকে নামানোর জন্য আমেরিকা ক্ষেত্রবিশেষে তার পারমাণবিক আইন শিথিল করতেও রাজি ছিল; আবার অন্যদিকে ভারতকে চাপে রাখতে পারমাণবিক চর্চা ও সামরিক ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে সাহায্য করতেও আমেরিকা প্রস্তুত হয়ে ওঠে।

এই টানাপোড়েন চলাকালীনই ১৯৫৩ সালে মার্কিন পররাষ্ট্রসচিব জন ফস্টার ডালেস পাকিস্তান পরিভ্রমণে আসেন। ভারত থেকে চীনে থোরিয়াম সরবরাহের ব্যাপারে ডালেসের তীব্র আপত্তি ছিল। পাকিস্তান সফরকালে ডালেস ওয়াশিংটনে বার্তা পাঠিয়েছিলেন যে, এশিয়ায় কমিউনিজম প্রতিরোধে পাকিস্তান নৈতিক শক্তিতে ভরপুর এক রাষ্ট্র। দেশে ফিরে তিনি এমনও মন্তব্য করেছিলেন যে, পাকিস্তান সামরিকতায় ও আধ্যাত্মিকতায় অতি উন্নত রাষ্ট্র; অথচ ভারতের জোটনিরপেক্ষ ও স্বাধীন নীতির কারণে তিনি পণ্ডিত নেহরুকে একজন অত্যন্ত অবাস্তববাদী রাজনীতিজ্ঞ বলে অভিহিত করেছিলেন।

আমেরিকার এই দ্বিমুখী নীতির মূলে ছিল চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঘিরে তাদের গভীর আতঙ্ক। চীনে পরমাণু বোমা নির্মাণ ও মজুতের আশঙ্কায় আমেরিকা যথেষ্ট শঙ্কিত ছিল; আবার মার্কিন পরমাণু বোমার ধ্বংসাত্মক শিল্পের অগ্রগতির ভয়াবহতা সামনে রেখেই চীনও আত্মরক্ষার তাগিদে পরমাণু শক্তি চর্চায় ব্রতী হয়েছিল। চীন ও সোভিয়েত রাশিয়ার তৎকালীন সম্মিলিত সামরিক শক্তি মার্কিন প্রশাসনের কাছে ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। চীন তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তায় পারমাণবিক শক্তির জগতে অনেকখানি উন্নতি সাধন করেছিল এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন, চিকিৎসা ও কৃষি সার তৈরির মতো শান্তিপূর্ণ কাজেও তারা যথেষ্ট পরিমাণে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার শুরু করেছিল। আমেরিকা একদিকে চীনের পরমাণু বোমা তৈরির উদ্যোগকে প্রবল সমালোচনার মুখে ফেলে, অন্যদিকে এশিয়া মহাদেশে ভারতকে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে খাড়া করার উদ্দেশ্যে ভারতের পারমাণবিক চর্চাকে নিজেদের কুক্ষিগত করার চেষ্টা চালায়। ভারত যখন শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের লক্ষ্যে পারমাণবিক শক্তির বিকাশে ইচ্ছা প্রকাশ করে, তখন সোভিয়েত রাশিয়া এবং আমেরিকা উভয়েই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল; কিন্তু মার্কিন প্রশাসনের প্রধান দুশ্চিন্তা ছিল ভারত যেন পারমাণবিক শক্তির ব্যাপারে কোনোভাবেই সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে ঢলে না পড়ে।

৩.২ ‘শান্তির জন্য পরমাণু’ ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) গঠন

ভারত ও চীনের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বাধীন পরমাণু চর্চায় কেবল দ্বিপাক্ষিক চাপ সৃষ্টি করেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্ষান্ত হয়নি, বরং বিশ্বের যাবতীয় পরমাণু সম্পদের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য একটি বৈশ্বিক কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেয়। এই লক্ষ্যে ১৯৫৩ সালের ৮ ডিসেম্বর রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ সভায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ার ‘শান্তির জন্য পরমাণু চর্চা’ (Atoms for Peace) শীর্ষক এক প্রস্তাব উত্থাপন করেন এবং একটি আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থা গঠনের সুপারিশ করেন। আইজেনহাওয়ারের প্রস্তাবের মূল কথা ছিল, বিশ্বের পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহের সম্পূর্ণ দায়ভার এই আন্তর্জাতিক সংস্থার ওপর ন্যস্ত করা হবে। এর পেছনে আমেরিকার আসল উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের নিরাপত্তা সম্পর্কে নিশ্চিন্ত থাকা, যাতে পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবহার করে তথাকথিত ‘নিউক্লিয়ার ক্লাব’-এর গুটিকয়েক সদস্য রাষ্ট্র ছাড়া বিশ্বের অন্য কোনো দেশ পরমাণু বোমা তৈরি করার সুযোগ না পায়।

প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ারের এই একাধিপত্যবাদী প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভারতের প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু লোকসভায় দাঁড়িয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। নেহরু অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় সংসদকে জানান যে, আন্তর্জাতিক সংস্থার আড়ালে বিশ্বের সমস্ত পারমাণবিক সম্পদের ওপর কেবলমাত্র একটি বিশেষ দেশের আধিপত্য তৈরি করার চেষ্টা চলছে। তিনি আরও ইঙ্গিত করেন যে, মার্কিন সাম্রাজ্যের এই কৌশলের মূল লক্ষ্যবস্তু হলো চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তি এবং এশিয়া-আফ্রিকার সদ্য স্বাধীন উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিজ্ঞানচর্চাকে নিয়ন্ত্রণ করা। উল্লেখ্য, সেই সময় সমাজতান্ত্রিক চীন রাষ্ট্রসঙ্ঘের সদস্যপদ পায়নি এবং তাইওয়ানই সমগ্র চীনের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রসঙ্ঘে প্রতিনিধিত্ব করত।

পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক সংস্থা তৈরির রূপরেখা নির্ধারণের জন্য রাষ্ট্রসঙ্ঘে যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা শুরু হয়, তাতে ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন বর্ষীয়ান কূটনীতিবিদ ভি. কে. কৃষ্ণ মেনন। কৃষ্ণ মেনন নীতিগতভাবে আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থা তৈরির পক্ষে সায় দিলেও ভারতের কৌশলগত স্বার্থরক্ষায় এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শর্ত উত্থাপন করেন। তিনি জোরালোভাবে উল্লেখ করেন যে, এই সংস্থার নিয়মাবলীর কারণে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর শান্তিপূর্ণ পরমাণু চর্চার পথে যেন কোনোরূপ বাধার সৃষ্টি না হয়।

শেষ পর্যন্ত কৃষ্ণ মেননের এই সংশোধনী প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং গঠিত হয় ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি’ (IAEA) বা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা। এই সংস্থার বিধিব্যবস্থা অনুযায়ী নির্ধারিত হয় যে, বিশ্বের কোনো দেশকে পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ করার আগে রপ্তানিকারক দেশকে বাধ্যতামূলকভাবে এই সংস্থার অনুমতি নিতে হবে। যদিও উন্নয়নশীল বিশ্বের স্বার্থরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তবুও বাস্তবে এই সংস্থার ওপর মার্কিন কূটনীতি ও আধিপত্য যথেষ্ট পরিমাণে বজায় থাকে, যার প্রমাণ মেলে বহু দশক পরে ২০০৫ সালের ১৮ জুলাই স্বাক্ষরিত ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তির সময়ও, যেখানে আমেরিকা থেকে জ্বালানি পাওয়ার জন্য এই সংস্থার অনুমোদন ও পরিদর্শনের শর্তকে প্রধান হাতিয়ার করা হয়েছিল।

৩.৩ ভারতের প্রাথমিক গবেষণা ও বিদ্যুৎ চুল্লি নির্মাণ (অপ্সরা, সাইরাস ও রাওয়াতভাটা)

রাষ্ট্রসঙ্ঘে যখন আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থা গঠন নিয়ে গোটা বিশ্বজুড়ে তুমুল কূটনৈতিক আলোচনা চলছিল, ঠিক সেই সময়েই ভারতে প্রয়োজনীয় পারমাণবিক চুল্লি বা রিঅ্যাক্টর নির্মাণের জন্য ড. হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা জোরকদমে তোড়জোড় শুরু করেছিলেন। ভারতের পরমাণু বিজ্ঞানীরা ইউরেনিয়াম এবং দেশের অভ্যন্তরে থাকা বিপুল থোরিয়াম ভাণ্ডারকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য প্রাথমিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। ড. ভাবা জানতেন যে, চুল্লি নির্মাণ ও পরিচালনার মতো কারিগরি দক্ষতা ভারতে আগে থেকেই রয়েছে; কেবল আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মার্কিন বিরোধিতা কৌশলে এড়িয়ে প্রাথমিক পরিকাঠামোটি দাঁড় করানো প্রয়োজন।

এই পর্যায়ে ভারত অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে বৈদেশিক কূটনৈতিক সমীকরণকে নিজেদের বিজ্ঞানচর্চার কাজে লাগায়। চীনকে ভারত থেকে থোরিয়াম পাঠানোর ব্যাপারে আমেরিকা নারাজ হলেও, চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে কাজে লাগানোর জন্য মার্কিন প্রশাসন ভারতকে পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত ছিল। একই সময়ে কানাডার বিশেষজ্ঞরাও ভারতে পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসেন।

এই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও ভারতীয় বিজ্ঞানীদের নিজস্ব প্রচেষ্টার মেলবন্ধনে মুম্বাইয়ের ট্রম্বেতে গবেষণার জন্য পরপর দুটি ছোট মাপের গবেষণা চুল্লি (Research Reactor) নির্মিত হয়। ১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতের প্রথম গবেষণা চুল্লি ‘অপ্সরা’ (Apsara) এবং ১৯৬০ সালে মূলত কানাডার সহযোগিতায় তৈরি হয়ে যায় দ্বিতীয় গবেষণা চুল্লি ‘সাইরাস’ (CIRUS)। এর পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রথম পারমাণবিক চুল্লিটি মার্কিন সংস্থা জেনারেল ইলেকট্রিক কোম্পানির (General Electric Company) সাহায্যে মহারাষ্ট্রের তারাপুরে এবং দ্বিতীয় বিদ্যুৎ চুল্লিটি কানাডার সহায়তায় রাজস্থানের রাওয়াতভাটায় গড়ে ওঠে।

ভারতে মার্কিন ও পাশ্চাত্য সাহায্যে পরমাণু শক্তির চর্চা গড়ে উঠলেও, ভারতের এই কর্মসূচির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নিয়ে মার্কিন প্রশাসন প্রথম থেকেই যথেষ্ট সন্দিগ্ধ ছিল। ভারতের পরমাণু চুল্লিগুলোর ওপর কঠোর আন্তর্জাতিক নজরদারি চাপিয়ে দেওয়ার মার্কিন প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে ১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থার (IAEA) সভায় ড. হোমি ভাবা এক ঐতিহাসিক বক্তব্য রাখেন, যেখানে তিনি ভারতের নিজস্ব পারমাণবিক ব্যবস্থাগুলোর নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার সপক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরেন। উল্লেখ্য যে, ড. ভাবার এই প্রারম্ভিক পর্বের পর ভারতে পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের জন্য আর কোনো বৈদেশিক কারিগরি সাহায্যের প্রয়োজন হয়নি; কারণ অপ্সরা, সাইরাস বা রাওয়াতভাটার মতো প্রাথমিক প্রকল্পগুলোর মাধ্যমেই ভারতীয় কারিগর এবং বিজ্ঞানীরা সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে চুল্লি নির্মাণের যথেষ্ট দক্ষতা অর্জন করে নিয়েছিলেন।

৩.৪ চীন-ভারত যুদ্ধ (১৯৬২) এবং তারাপুর পারমাণবিক চুক্তির রাজনীতি (১৯৬৩)

পঞ্চাশের দশকের শেষভাগ এবং ষাটের দশকের শুরুতে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকে। কমিউনিস্ট চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব রুখতে আমেরিকার কাছে ভারতকে পাশে রাখা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে; কিন্তু অন্যদিকে আমেরিকা পাকিস্তানকেও সমান্তরালভাবে বিপুল সামরিক সহায়তা প্রদান করছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের ‘এনএসসি ৫৭০১’ (NSC 5701) শীর্ষক একটি গোপন দলিলে মার্কিন নীতিনির্ধারকরা নিজেরাই স্বীকার করেছিলেন যে, এই সময় ভারত এবং পাকিস্তান—উভয় দেশকে একসাথে তুষ্ট রাখা আমেরিকার পক্ষে অসম্ভব। পারমাণবিক শক্তি প্রসারণ বিরোধী চুক্তি সংক্রান্ত মার্কিন কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে প্রকাশিত এই নথিতে দেখা যায়, আমেরিকার মূল সমস্যা ছিল চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে নিজেদের শিবিরে পাওয়া নিয়ে, বিশেষ করে যখন ভারত তার পারমাণবিক শক্তি বিকশিত করার জন্য আমেরিকার কাছে সাহায্য প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে এক পা বাড়িয়েছিল।

কিন্তু ইতিমধ্যে একটি আন্তর্জাতিক ঘটনায় ভারত-মার্কিন সম্পর্কে সাময়িক শৈত্য দেখা দেয়। পাকিস্তানের ঘাঁটি থেকে ওড়ানো একটি মার্কিন গোয়েন্দা বিমান (U-2) গোপনে সোভিয়েত ইউনিয়নের সীমানা অতিক্রম করলে সোভিয়েত বাহিনী দূরপাল্লার মিসাইল ছুড়ে বিমানটিকে মাটিতে নামিয়ে আনে এবং মার্কিন পাইলট ধরা পড়ে। এই ঘটনাটি নিয়ে রাষ্ট্রসঙ্ঘে যখন তুমুল আলোচনা শুরু হয়, তখন ভারত নীতিগতভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষ অবলম্বন করে। ভারতের এই অবস্থানের ফলে মার্কিন পক্ষ খানিকটা দমে যায়। তবুও আমেরিকার কৌশলগত ধারণা ছিল এই যে, কমিউনিস্ট চীনের বিরুদ্ধে এশিয়ার দেশগুলোকে ব্যবহার করতে গেলে ভারতকে পাশে পেতেই হবে—ঠিক যেমন সোভিয়েত ইউনিয়নের সীমারেখার মধ্যে মার্কিন গোয়েন্দা বিমান ওড়ানোর সুযোগ দিয়ে পাকিস্তান আমেরিকাকে সাহায্য করেছিল।

বিশেষজ্ঞ জর্জ পারকোভিচের (George Perkovich) লেখা বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ইন্ডিয়াজ নিউক্লিয়ার বম্ব’ (India's Nuclear Bomb)-এ ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভসের ভারত সম্পর্কিত ১৯৬১ সালের ১৩ সেপ্টেম্বরের একটি মার্কিন দলিলের উল্লেখ পাওয়া যায়। ওই দলিলের সাক্ষ্য অনুযায়ী, চীন পরমাণু বোমা বিস্ফোরণের প্রস্তুতি নেওয়ায় আমেরিকার একাংশ চেয়েছিল চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভারত যেন এশিয়ায় অতিসত্বর প্রথম পরমাণু বিস্ফোরণটি ঘটায়। তবে ওই মার্কিন দলিলে দুটি বড় অসুবিধার কথাও ব্যক্ত করা হয়েছিল: প্রথমত, পরমাণু বোমা বা বিস্ফোরণের ব্যাপারে শান্তিবাদী পণ্ডিত নেহরুর কাছ থেকে সম্মতি নাও পাওয়া যেতে পারে; এবং দ্বিতীয়ত, ভারতকে এ কাজে মদত দিলে তার প্রতিক্রিয়ায় সোভিয়েত রাশিয়ার মদতে চীনের পারমাণবিক চর্চা আরও দ্রুততর হয়ে উঠবে। এই দোলাচলের কারণে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রসচিব ডিন রাস্ক (Dean Rusk) সরাসরি পারমাণবিক অস্ত্র রাজনীতির ব্যাপারে ভারতকে শেষ পর্যন্ত জড়াতে চাইছিলেন না এবং ভারতের তারাপুরে পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের সহযোগিতার বিষয়টি নিয়েও মার্কিন প্রশাসনের অন্দরে তীব্র টানাপোড়েন চলছিল।

১৯৬২ সালে তারাপুর চুল্লি নিয়ে মার্কিন সহায়তায় এই ঢিলেমি দেখা দিলে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে পারমাণবিক প্রযুক্তির জন্য সাহায্য পাওয়ার একটি উজ্জ্বল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, কিন্তু ভারত সেই মুহূর্তে সোভিয়েত পথে অগ্রসর হয়নি। ইতিমধ্যে ১৯৬২ সালেই সংঘটিত হয় চীন-ভারত সীমান্ত যুদ্ধ। রাশিয়ার গোয়েন্দা অন্তর্জালের মাধ্যমে ফাঁস হওয়া বিভিন্ন তথ্য থেকে চীনের বুঝতে বাকি রইল না যে এই সংঘাতের পেছনে আমেরিকারও অভিসন্ধি রয়েছে। ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্ত সংক্রান্ত সমস্যাটি অত্যন্ত জরুরি ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও দুই দেশের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলে এবং সেই সীমান্ত সমস্যা আজও বর্তমান রয়ে গেছে।

১৯৬২ সালের এই চীন-ভারত যুদ্ধের ফলে ভারতের প্রতি আমেরিকার প্রত্যক্ষ সহানুভূতি হঠাৎ করেই অনেকটা বেড়ে যায়। এই ভূ-রাজনৈতিক সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে আমেরিকা ১৯৬৩ সালে মহারাষ্ট্রের তারাপুরে পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের সহায়তার জন্য এগিয়ে আসে এবং চুল্লির জন্য প্রয়োজনীয় পারমাণবিক জ্বালানির জোগান দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই সাহায্যের বিনিময়ে একটি কঠোর শর্ত চাপিয়ে দেয় যে, তারাপুরের এই পারমাণবিক চুল্লি ও গবেষণা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ও পরিদর্শনের অধীনে থাকবে।

বিজ্ঞানী ড. হোমি ভাবা এই আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের শর্তের তীব্র আপত্তি জানিয়েছিলেন, কারণ তখন বিশ্বের অন্য কোথাও এই সংস্থার এহেন পরিদর্শনের ব্যবস্থা চালু ছিল না। কিন্তু চীন-ভারত যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক চাপে ভারতের পক্ষে ড. ভাবার সেই আপত্তি শেষ পর্যন্ত টেকেনি এবং ভারতকে ওই শর্ত মেনে নিতে হয়।

তারাপুর চুক্তির কারিগরি ও অর্থনৈতিক দিকটিও ছিল ভারতের স্বনির্ভরতার পরিপন্থী। মার্কিন প্রযুক্তিবিদরা তারাপুরে যে হালকা জলের পারমাণবিক চুল্লি (Boiling Water Reactor) নির্মাণে সহায়তা করেছিলেন, তার নকশা এমন ছিল যে তাতে কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম (Enriched Uranium) জ্বালানিই ব্যবহৃত হতে পারত। অথচ ভারতের নিজস্ব খনিজ সম্পদ ভাণ্ডার থেকে যে প্রাকৃতিক ইউরেনিয়াম ও থোরিয়াম সংগৃহীত হয়, তা থেকে বিশেষ খরচ ও জটিল প্রযুক্তিসাপেক্ষ পাঁচটি রাসায়নিক কম্পাউন্ডের প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে ইউরেনিয়াম-২৩৩ বা দেশীয় জ্বালানি বের করে আনা সম্ভব হলেও তারাপুরের মার্কিন চুল্লিতে তা সরাসরি ব্যবহারের উপায় ছিল না। সমালোচকদের মতে, তারাপুর প্রকল্পের ক্ষেত্রে ভারত তার নিজস্ব পারমাণবিক স্বনির্ভরতার নীতি বজায় রাখতে পারেনি এবং অজস্র বিদেশি মুদ্রা ব্যয় করে মার্কিন চুল্লি কেনার কোনো প্রয়োজন ছিল না।

তারাপুরের এই দুটি চুল্লি নির্মাণের জন্য মার্কিনিদের কাছে ভারতের ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৮০ লক্ষ ডলার, যা দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে পরিশোধযোগ্য ছিল। এই বিপুল ঋণের বোঝার পাশাপাশি চুক্তি অনুযায়ী ভারতকে চুল্লি সচল রাখার জন্য একচেটিয়াভাবে আমেরিকার কাছ থেকেই পারমাণবিক জ্বালানি ক্রয় করতে হতো। মার্কিন জ্বালানির ওপর এই নির্ভরশীলতাকে যে আমেরিকা রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, তার চূড়ান্ত প্রমাণ মেলে ১৯৭৪ সালে—যখন পোখরানে ভারতের প্রথম পরীক্ষামূলক পারমাণবিক বিস্ফোরণের পরই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে আমেরিকা একতরফাভাবে তারাপুর চুল্লির জ্বালানি আমদানি বন্ধ করে দেয়।

ভারতের পরমাণু চর্চা (দ্বিতীয় পর্ব): ভারতে পরমাণু গবেষণার সূচনা ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপন (১৯৪৪–১৯৫৪) -
Tushar Gorai
Oct. 31, 2026 | category | views:1 | likes:0 | share: 0 | comments:0

সদ্য স্বাধীন ভারতের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং আধুনিক বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে ১৯৪৪ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত দশকটি ছিল প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের সময়কাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলা এবং হিরোশিমা ও নাগাসাকির মানবিক বিপর্যয় ভারতীয় রাষ্ট্রনেতাদের মনে মারণাস্ত্র নির্মাণের বিরুদ্ধে তীব্র নৈতিক অবস্থান তৈরি করলেও, দেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক বিকাশের স্বার্থে পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা তাঁরা শুরু থেকেই অনুধাবন করেছিলেন। এই দশকে একদিকে যেমন দূরদর্শী বিজ্ঞানীদের উদ্যোগে ভারতের নিজস্ব গবেষণাগার ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে ওঠে, অন্যদিকে তেমনই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গোপনীয়তা রক্ষা ও স্বনির্ভর প্রযুক্তি বিকাশের জন্য সুনির্দিষ্ট আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামো নির্মিত হয়।

২.১ হোমি জাহাঙ্গীর ভাবার দূরদর্শিতা ও টাটা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা

ভারতে পরমাণু শক্তি চর্চার প্রারম্ভিক ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন বিজ্ঞানী ড. হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা, যাঁকে যথার্থই ভারতের পরমাণু শক্তি চর্চার জনক হিসেবে অভিহিত করা হয়। পরমাণু শক্তির সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে ড. ভাবা প্রথম থেকেই অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন এবং ভারতের পরমাণু গবেষণার ভিত্তি নির্মাণে তাঁর অবদান ছিল অপরিসীম। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে তিনি কসমিক রে (Cosmic Ray) বা মহাজাগতিক রশ্মি বিষয়ক গবেষণায় ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। বিদেশে অবস্থানকালে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন খ্যাতনামা বিজ্ঞানীদের গবেষণাগারগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পান এবং আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের প্রায়োগিক ও প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন।

বিদেশ থেকে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পর ড. ভাবা বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স (Indian Institute of Science) সংস্থায় গবেষণা ও স্নাতকোত্তর বিজ্ঞান কেন্দ্রে রিডার ও লেকচারার হিসেবে যোগদান করেন। তাঁর মৌলিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ পরবর্তীকালে তিনি ব্রিটেনের মর্যাদাপূর্ণ রয়্যাল সোসাইটির ফেলো (Fellow of the Royal Society) নির্বাচিত হন। বেঙ্গালুরুতে গবেষণারত অবস্থাতেই তিনি অনুভব করেন যে, ভারতে বিশ্বমানের পারমাণবিক গবেষণা পরিচালনার জন্য একটি স্বতন্ত্র ও অত্যাধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামো প্রয়োজন।

ড. ভাবার দূরদর্শিতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে ১৯৪৪ সালে গৃহীত তাঁর ঐতিহাসিক উদ্যোগটির মধ্যে। ১৯৪৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পরমাণু বোমার প্রথম পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটানোরও এক বছর আগে, ১৯৪৪ সালে বিজ্ঞানী ভাবা ভারতে একটি পারমাণবিক গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পগোষ্ঠী টাটা গোষ্ঠীর সাথে আলোচনা শুরু করেন। টাটা ট্রাস্টের কাছে পেশ করা প্রস্তাবে ড. ভাবা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন যে, এই ধরনের উচ্চমানের গবেষণার জন্য ভারতে ইতিমধ্যেই দক্ষ এবং কুশলী বিজ্ঞানীরা রয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, ধ্বংসাত্মক কাজে এই পরমাণু প্রযুক্তি ব্যবহার না করেও কেবলমাত্র দেশের শিল্পায়নের প্রভূত উন্নতির জন্য এই প্রযুক্তিকে সফলভাবে ব্যবহার করা সম্ভব।

বিজ্ঞানী ভাবার এই দূরদর্শী আবেদন অনুযায়ী টাটা ট্রাস্ট ফান্ডের অনুমোদনে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ’ (Tata Institute of Fundamental Research - TIFR)। ভারতের পরমাণু কর্মসূচির বিকাশে এই প্রতিষ্ঠানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুধাবন করে ড. ভাবা স্বয়ং এই সংস্থাকে ভারতের পরমাণু চর্চার শিশুর লালন-পালনের দোলনা হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। বস্তুত, পরবর্তীকালে ভারতের পরমাণু কর্মসূচির মূল কারিগর ও বিজ্ঞানীদের প্রথম প্রজন্মটি এই প্রতিষ্ঠানের গবেষণাগারেই গড়ে উঠেছিল।

২.২ আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো: রিসার্চ কমিটি ও ১৯৪৮-এর অ্যাটমিক এনার্জি অ্যাক্ট

ভারত স্বাধীনতা লাভের পূর্ববর্তী সময় থেকেই পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার উন্নতির মাধ্যমে দেশের আধুনিকীকরণের কথা বিভিন্ন সভা-সমিতিতে ধারাবাহিকভাবে বলে আসছিলেন। পরমাণু শক্তির ধ্বংসাত্মক দিকটির পাশাপাশি এর গঠনমূলক প্রক্রিয়া সম্পর্কেও তিনি জাতিকে সুস্পষ্ট দিশা নির্দেশ দিয়েছিলেন। টাটা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার পর ভারতের পরমাণু গবেষণাকে কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই লক্ষ্যে টাটা ইনস্টিটিউটের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ১৯৪৬ সালে ভারতে গঠিত হয় ‘অ্যাটমিক এনার্জি রিসার্চ কমিটি’ (Atomic Energy Research Committee)। এই সংস্থার মাধ্যমেই ভারতের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পারমাণবিক বিজ্ঞান চর্চার ব্যাপক প্রসার ঘটে।

১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর পরমাণু গবেষণাকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও আইনি সুরক্ষার অধীনে আনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর প্রত্যক্ষ প্রচেষ্টায় ১৯৪৮ সালে ভারতের গণপরিষদে (Constituent Assembly) গৃহীত হয় ‘অ্যাটমিক এনার্জি অ্যাক্ট’ (Atomic Energy Act) বা পরমাণু শক্তি আইন। সদ্য স্বাধীন একটি দেশের পক্ষে এই আইন প্রণয়ন ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এক কৌশলগত পদক্ষেপ।

১৯৪৮ সালের এই আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণ গোপনীয়তা বজায় রেখে দেশের অভ্যন্তরে দক্ষ পরমাণু বিজ্ঞানী এবং প্রযুক্তিবিদদের গড়ে তোলা ভারতের মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে। ঠান্ডা যুদ্ধের সেই প্রারম্ভিক পর্বে পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর একচেটিয়া আধিপত্যের মুখে ভারতীয় বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত নবতর প্রযুক্তিগুলো বহির্বিশ্বের কাছে উন্মুক্ত না করাই ছিল এই আইনের একমাত্র ও প্রধান উদ্দেশ্য। এই আইনি সুরক্ষার ফলে ভারতীয় বিজ্ঞানীরা সম্পূর্ণ নিজস্ব পরিবেশে হাতে-কলমে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দেশীয় পারমাণবিক প্রযুক্তি আবিষ্কারে ব্রতী হন এবং পরবর্তীকালে নতুন ধরনের ফাস্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টর (Fast Breeder Reactor) বা চুল্লি উদ্ভাবনে সক্ষম হন। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত ভারতীয় বিজ্ঞানীরা মারণাস্ত্র বা পরমাণু বোমা তৈরিতে সরাসরি কৌতূহলী না হলেও, দীর্ঘদিনের নিরবচ্ছিন্ন চর্চা ও গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে অর্জিত এই প্রযুক্তিগত ভিত্তিই পরবর্তীকালে ভারতকে পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটানো এবং বোমা বহনকারী ব্যালিস্টিক মিসাইল নির্মাণের সক্ষমতা এনে দিয়েছিল।

২.৩ ড. মেঘনাদ সাহার ভূমিকা এবং পরমাণু শক্তি দপ্তর (DAE) গঠন (১৯৫৪)

পঞ্চাশের দশকের শুরুতে ভারতে যখন পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণ এবং জ্বালানি গবেষণার প্রাথমিক প্রস্তুতি চলছিল, তখন এর কারিগরি ও কূটনৈতিক ঝুঁকিগুলোও ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। শান্তিপূর্ণ কাজে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন ছিল সুদূরপ্রসারী ও সুবিস্তৃত পরিকল্পনা, জটিল তাত্ত্বিক বিষয়বস্তুর ওপর গভীর দক্ষতা এবং নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ইউরেনিয়াম, প্লুটোনিয়াম এবং থোরিয়াম জ্বালানির ব্যবহারিক প্রয়োগে বিজ্ঞানীদের নানাবিধ কারিগরি জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়। এছাড়াও ভারী জলের চুল্লি, হালকা জলের চুল্লি কিংবা গবেষণাকর্মে সহায়ক চুল্লিগুলোর পরিচালনা ও মেরামতি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিসাপেক্ষ কাজ। এর পাশাপাশি চুল্লির যন্ত্রাংশ আমদানি, বিদেশ থেকে পারমাণবিক জ্বালানি সংগ্রহ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক বিরোধিতা এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থার পরিদর্শনের মতো জটিল ভূ-রাজনৈতিক বিষয়গুলোও ভারতের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উপস্থিত ছিল।

এই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও সংবেদনশীল কাজে ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পদার্থবিজ্ঞানী ড. মেঘনাদ সাহা প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত নেহরুকে সর্বাগ্রে সচেতন করেন। ড. সাহা উপলব্ধি করেছিলেন যে, আন্তর্জাতিক স্তরে পরমাণু শক্তি নিয়ে যেহেতু তীব্র জটিলতা রয়েছে, তাই দেশে পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর স্থাপন ও পরিচালনার ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্ব এবং সর্বোচ্চ সাবধানতা অবলম্বন করা অপরিহার্য।

পরমাণু গবেষণার ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণের জন্য ১৯৫৪ সালের ২৬ ও ২৭ নভেম্বর পণ্ডিত নেহরু এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। বিষয়টির কৌশলগত গোপনীয়তা ও গুরুত্ব বিবেচনা করে তিনি কোনো প্রকাশ্য স্থানে না গিয়ে নিজের বাসভবনেই ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণাগারে কর্মরত শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানীদের নিয়ে পরমাণু শক্তি সম্পর্কিত একটি উচ্চপর্যায়ের সভার আয়োজন করেন।

দুই দিনব্যাপী এই গুরুত্বপূর্ণ সভার মূল বক্তা ছিলেন ড. মেঘনাদ সাহা। তাঁর সুচিন্তিত বক্তব্যে তিনি পরমাণু শক্তির উৎপাদন ও ব্যবহারের জন্য দেশে দক্ষ প্রযুক্তিবিদ গড়ে তোলার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেন এবং এই উদ্দেশ্যে নানা ধরনের বিশেষায়িত গবেষণাগার ও সংস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন। এই সমস্ত বহুমুখী গবেষণা ও কারিগরি কর্মকাণ্ডকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার জন্য একটি একক কেন্দ্রীয় দপ্তরের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এরই ফলশ্রুতিতে সেই ১৯৫৪ সালেই সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব এখতিয়ারে ‘ডিপার্টমেন্ট অফ অ্যাটমিক এনার্জি’ (Department of Atomic Energy - DAE) বা পরমাণু শক্তি দপ্তরের মূল কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।

নবগঠিত এই পরমাণু শক্তি দপ্তরের (DAE) সামনে চারটি সুনির্দিষ্ট মূল উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল: ১. পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে পরমাণু শক্তির সাহায্যে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা স্থাপন করা। ২. পরমাণু প্রযুক্তির জটিল কাজ পরিচালনার জন্য দেশের ভেতরেই একদল দক্ষ ও কুশলী প্রযুক্তিবিদ গোষ্ঠী গড়ে তোলা। ৩. দেশের বিজ্ঞানীদের মৌলিক ও ফলিত গবেষণাকর্মে সহায়তার জন্য নিজস্ব গবেষণামূলক পারমাণবিক চুল্লি গড়ে তোলা। ৪. পারমাণবিক চুল্লি থেকে রেডিও আইসোটোপ (Radioisotope) সংগ্রহ করে এনে মানুষের নানা জটিল রোগের ঔষধ তৈরি এবং কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য উপাদান প্রস্তুতির আয়োজন করা।

২.৪ সহযোগী গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং বহুমুখী প্রাতিষ্ঠানিক জাল বিস্তার

১৯৫৪ সালে পরমাণু শক্তি দপ্তর (DAE) প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর, পরমাণু শক্তির উৎপাদন এবং তার বহুমুখী ব্যবহার ও প্রয়োগ সংক্রান্ত বিভিন্ন বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান তৈরি করে সেগুলোকে সরাসরি এই কেন্দ্রীয় দপ্তরের অধীনে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। ভারতের পরমাণু কর্মসূচিকে স্বনির্ভর করে তুলতে এই প্রতিষ্ঠানগুলো একেকটি স্তম্ভ হিসেবে কাজ করেছে। পরমাণু শক্তি দপ্তরের অধীনে গড়ে ওঠা এই প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলো হলো:

  • ভাবা অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টার (Bhabha Atomic Research Centre - BARC): পরমাণু বিজ্ঞানের মৌলিক ও ফলিত গবেষণা এবং চুল্লি প্রযুক্তির বিকাশে ভারতের প্রধানতম গবেষণা কেন্দ্র।
  • সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড টেকনোলজি (Centre for Advanced Technology - CAT): উন্নততর পারমাণবিক ও আনুষঙ্গিক প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও গবেষণার জন্য গঠিত বিশেষ সংস্থা।
  • ভেরিয়েবল এনার্জি সাইক্লোট্রন সেন্টার (Variable Energy Cyclotron Centre - VECC): কণা ত্বরক বা সাইক্লোট্রনের সাহায্যে নিউক্লীয় পদার্থবিজ্ঞান এবং রেডিও আইসোটোপ গবেষণার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
  • অ্যাটমিক মিনারেলস ডাইরেক্টরেট (Atomic Minerals Directorate - AMD): দেশের অভ্যন্তরে ইউরেনিয়াম ও থোরিয়ামের মতো পারমাণবিক খনিজ সম্পদের অনুসন্ধান ও জরিপ পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা।
  • হেভি ওয়াটার বোর্ড (Heavy Water Board): ভারতের পারমাণবিক চুল্লিগুলোতে মডারেটর ও কুল্যান্ট হিসেবে অপরিহার্য ভারী জল (Heavy Water) উৎপাদনের জন্য প্রতিষ্ঠিত সংস্থা।
  • নিউক্লিয়ার ফুয়েল কমপ্লেক্স (Nuclear Fuel Complex - NFC): প্রাকৃতিক আকরিক থেকে পরিশোধিত পারমাণবিক জ্বালানি এবং চুল্লির প্রয়োজনীয় উপাদান প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান।

১৯৪৪ থেকে ১৯৫৪ সালের মধ্যে গড়ে ওঠা এই সুদৃঢ় প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামোর ফলেই ড. হোমি ভাবার পরবর্তী সময়ে ভারতে পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের জন্য আর বৈদেশিক কারিগরি সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে হয়নি; ভারতীয় কারিগর এবং বিজ্ঞানীরা নিজেরাই সেই উচ্চতর দক্ষতা অর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন। ভারতের বিপুল থোরিয়াম ভাণ্ডারকে কাজে লাগিয়ে সুলভে দেশবাসীর বিদ্যুতের প্রয়োজন মেটানোর যে নিরন্তর প্রচেষ্টা ভারতীয় বিজ্ঞানীরা চালিয়ে যাচ্ছেন, তার প্রকৃত বীজটি রোপিত হয়েছিল এই দশকের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগগুলোর মাধ্যমেই।

ভারতের পরমাণু চর্চা(প্রথম পর্ব): পরমাণু শক্তির বিজ্ঞান এবং বিশ্ব রাজনীতির প্রারম্ভিক প্রেক্ষাপট -
Tushar Gorai
Oct. 31, 2026 | category | views:14 | likes:0 | share: 2 | comments:0

বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিহাসে পরমাণু শক্তির উদ্ভাবন মানব সভ্যতার সামনে এক যুগপৎ সম্ভাবনা ও সংকটের দ্বার উন্মোচন করেছে। একদিকে এই শক্তি যেমন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং কৃষিক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, অন্যদিকে তেমনই মারণাস্ত্রের প্রতিযোগিতায় বিশ্ব রাজনীতিকে ঠেলে দিয়েছে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে। ভারতে পরমাণু গবেষণার ঐতিহাসিক বিকাশ এবং এর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমীকরণ অনুধাবন করতে হলে প্রথমেই পরমাণু শক্তির মৌলিক বৈজ্ঞানিক ভিত্তি এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বৈশ্বিক রাজনীতির প্রারম্ভিক প্রেক্ষাপটটি বিশ্লেষণ করা অপরিহার্য।

১.১ পরমাণু শক্তির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি: বিভাজন (Fission) ও সংযোজন (Fusion)

পদার্থের ক্ষুদ্রতম একক পরমাণুর কেন্দ্রে বা নিউক্লিয়াসে প্রোটন এবং নিউট্রন কণাগুলো প্রবল সবল নিউক্লীয় বলের (Strong Nuclear Force) মাধ্যমে আবদ্ধ থাকে। সাধারণ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় কেবল পরমাণুর বাইরের কক্ষপথের ইলেকট্রনের আদান-প্রদান ঘটে, কিন্তু নিউক্লীয় বিক্রিয়ায় সরাসরি পরমাণুর কেন্দ্রস্থলের পরিবর্তন ঘটে। প্রচলিত কাঠ বা কয়লা পোড়ানোর মতো রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় যে তাপশক্তি পাওয়া যায়, পারমাণবিক প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন শক্তির পরিমাণ তার তুলনায় বহুগুণ বেশি। মূলত দুটি প্রধান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরমাণুর কেন্দ্র থেকে এই বিপুল শক্তি নির্গত হয়—পরমাণু বিভাজন বা ফিশন (Nuclear Fission) এবং পরমাণু সংযোজন বা ফিউশন (Nuclear Fusion)।

প্রথম পদ্ধতি অর্থাৎ পরমাণু বিভাজন বা ফিশন প্রক্রিয়ায় কোনো ভারী মৌলিক পদার্থের নিউক্লিয়াসকে আঘাত করে বিভাজিত করা হয় এবং সেখান থেকে নিউট্রন ও প্রোটন কণার পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে প্রচণ্ড শক্তি নির্গত হয়। আধুনিক নিউক্লীয় পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায়, ইউরেনিয়াম-২৩৫ (92U235), প্লুটোনিয়াম-২৩৯ (94Pu239) বা ইউরেনিয়াম-২৩৩ (92U233)-এর মতো ভারী ও অস্থিতিশীল নিউক্লিয়াসকে যখন ধীরগতির তাপীয় নিউট্রন (Thermal Neutron) দিয়ে আঘাত করা হয়, তখন সেটি ভেঙে দুটি তুলনামূলকভাবে হালকা নিউক্লিয়াসে পরিণত হয় এবং তার সাথে অতিরিক্ত দু-তিনটি মুক্ত নিউট্রন ও বিপুল পরিমাণ গতিশক্তি ও গামা রশ্মি নির্গত হয়। ইউরেনিয়াম-২৩৫ নিউক্লিয়াসের একটি আদর্শ বিভাজন বিক্রিয়াকে নিচের সমীকরণের মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়:

92U235 +0n1---> 56Ba141+36Kr92+30n1+Q(শক্তি)

এই প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন অতিরিক্ত নিউট্রনগুলো পুনরায় পার্শ্ববর্তী ইউরেনিয়াম নিউক্লিয়াসকে আঘাত করে এবং একটি শৃঙ্খল বিক্রিয়া (Chain Reaction) শুরু হয়। এই শৃঙ্খল বিক্রিয়াকে যখন পারমাণবিক চুল্লি বা রিঅ্যাক্টরের (Nuclear Reactor) ভেতরে নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় পরিচালনা করা হয়, তখন তা থেকে প্রাপ্ত তাপশক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাষ্পীয় টারবাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। অন্যদিকে, এই শৃঙ্খল বিক্রিয়া যখন অনিয়ন্ত্রিতভাবে মুহূর্তের মধ্যে সংঘটিত হয়, তখন তা পারমাণবিক বোমার মতো প্রলয়ংকরী বিস্ফোরণ ঘটায়।

দ্বিতীয় পদ্ধতিটি হলো পরমাণু সংযোজন বা ফিউশন (Nuclear Fusion), যেখানে একাধিক হালকা মৌলিক পদার্থের নিউক্লিয়াসের মধ্যে প্রোটন বা নিউট্রন যুক্ত হয়ে একটি অপেক্ষাকৃত ভারী নিউক্লিয়াস গঠন করে এবং সেই সংযোজন প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়। যেমন—উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপে হাইড্রোজেনের দুটি আইসোটোপ ডিউটেরিয়াম (1H2) এবং ট্রিটিয়াম (1H3) সংযোজিত হয়ে হিলিয়াম (2He4) নিউক্লিয়াস, একটি মুক্ত নিউট্রন এবং বিপুল শক্তি উৎপাদন করে:

1H2 + 1H3 ---> 2He4 + 0n1 + 17.6 MeV

উভয় প্রক্রিয়াতেই শক্তি নির্গমনের মূল উৎস হলো আলবার্ট আইনস্টাইনের ভর-শক্তি সমতুল্যতা সূত্র। বিক্রিয়ার পূর্ববর্তী মোট ভর এবং বিক্রিয়ার পরবর্তী মোট ভরের মধ্যে যে সূক্ষ্ম পার্থক্য বা ভরত্রুটি দেখা যায়, সেটিই আলোর বেগের (c) বর্গের গুণফলের সমান শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। এই দুই পদ্ধতি মারফত যে পরিমাণ তাপ সৃষ্টি হয়, তা কয়লা পুড়িয়ে বা অন্য কোনো প্রচলিত জ্বালানি উৎস থেকে পাওয়া কার্যত অসম্ভব। একটি সুনির্দিষ্ট তুলনামূলক পরিসংখ্যান দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়: পরমাণু বিভাজনের প্রক্রিয়ায় মাত্র এক পাউন্ডের হাজার ভাগের এক ভাগ পদার্থ থেকে যে পরিমাণ শক্তি উৎপাদিত হয়, প্রচলিত পদ্ধতিতে সমপরিমাণ শক্তি পেতে হলে প্রায় পনেরশো (১,৫০০) টন কয়লা পোড়াতে হয়।

তবে শান্তিপূর্ণ কাজে এই অমিত পারমাণবিক উৎসের ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, জটিল তাত্ত্বিক ও কারিগরি বিষয়বস্তুর ওপর গভীর দক্ষতা এবং নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। প্রকৃতি থেকে সংগৃহীত আকরিক থেকে বিশেষ রাসায়নিক ও প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়ায় ইউরেনিয়াম, প্লুটোনিয়াম এবং থোরিয়াম জ্বালানি প্রস্তুত ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের নানাবিধ জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়। এছাড়াও ভারী জলের চুল্লি (Heavy Water Reactor), হালকা জলের চুল্লি (Light Water Reactor), ফাস্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টর (Fast Breeder Reactor) কিংবা গবেষণাকর্মে সহায়তার জন্য নির্মিত চুল্লিগুলোর পরিচালনা ও মেরামতি অত্যন্ত ঝুঁকিসাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল।

১.২ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং হিরোশিমা ও নাগাসাকির মানবিক বিপর্যয়

তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণাগার থেকে পরমাণু শক্তির প্রথম বাস্তব ও দৃশ্যমান আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল সৃষ্টিশীল কোনো কাজে নয়, বরং মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন মিত্রশক্তির অন্যতম প্রধান শরিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গোপনে পরমাণু বোমা নির্মাণের প্রকল্প পরিচালনা করে। ১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই ভোর সাড়ে পাঁচটায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোর মরুভূমিতে মানব ইতিহাসের প্রথম পরীক্ষামূলক আণবিক বিস্ফোরণটি ঘটানো হয়। এই সফল পরীক্ষার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই মার্কিন প্রশাসন বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে এই মারণাস্ত্র প্রয়োগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট দিনটি বিশ্ব মানব ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ওই দিন জাপানের জনবহুল শহর হিরোশিমায় প্রথম পরমাণু বোমা ‘লিটল বয়’ (Little Boy) নিক্ষেপ করে আমেরিকা। ইউরেনিয়াম-ভিত্তিক এই পরমাণু বোমার আঘাতে এক লহমায় হিরোশিমা শহরের অর্ধাংশ সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এবং প্রায় এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার (১,৫০,০০০) নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। শহরের বাকি অর্ধাংশ মানুষ তাৎক্ষণিক মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পেলেও পরমাণু বোমার মারাত্মক তেজস্ক্রিয় বিকিরণের (Radioactive Fallout) দীর্ঘমেয়াদী প্রতিক্রিয়া নিয়ে বেঁচে থাকতে বাধ্য হন। অন্ধত্ব, দুরারোগ্য ক্যান্সার, পঙ্গুত্ব এবং নানাবিধ জটিল রোগব্যাধিতে জর্জরিত হয়ে তাঁদের জীবন এক জীবন্ত নরকে পরিণত হয়।

হিরোশিমার এই নজিরবিহীন মারণযজ্ঞ ঘটিয়েও মার্কিন সামরিক প্রশাসন স্তব্ধ হয়নি। প্রথম বিস্ফোরণের মাত্র তিন দিন পর, ১৯৪৫ সালের ৯ আগস্ট জাপানের অপর একটি শহর নাগাসাকিতে দ্বিতীয় পরমাণু বোমা ‘ফ্যাটম্যান’ (Fat Man)-এর বিস্ফোরণ ঘটায় আমেরিকা। প্লুটোনিয়াম-ভিত্তিক এই দ্বিতীয় বিস্ফোরণের দিনেই প্রাণ হারান আরও প্রায় ৫০,০০০ মানুষ। বোমা বিধ্বস্ত দুটি শহরের আবাসস্থল ও নাগরিক পরিকাঠামো ধূলিসাৎ হয়ে যায়। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, যুদ্ধের সাথে যাদের কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক ছিল না, সেই সাধারণ অসামরিক নাগরিকদের কেবল হত্যাই করা হয়নি, বরং তেজস্ক্রিয় বিকিরণের জিনগত প্রভাবে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও চিরতরে অসুস্থ ও পঙ্গু করে দেওয়া হয়। এই দুই ভয়াবহ বিস্ফোরণের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ পরবর্তী দশকগুলোতে জাপানে কত শিশু যে বিকলাঙ্গ ও প্রতিবন্ধী হয়ে জন্মগ্রহণ করেছে, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান আজও নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি।

১.৩ সামরিক যৌক্তিকতা নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক ও ঠান্ডা যুদ্ধের সূচনা

হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পরমাণু বোমা নিক্ষেপের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের (Harry S. Truman) নেতৃত্বে যুদ্ধের ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতি ও মর্মান্তিকতাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে আমেরিকায় বিজয় উৎসব পালন করা হয়। তৎকালীন মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোও যুদ্ধের এই নিষ্ঠুরতাকে আড়াল করে একে মার্কিন সামরিক ও প্রযুক্তিগত সাফল্য হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে জনমানসে তুলে ধরেছিল। সরকারিভাবে দাবি করা হয়েছিল, জাপানি যুদ্ধবাজদের দ্রুত শায়েস্তা করতে এবং দীর্ঘস্থায়ী স্থলযুদ্ধে মার্কিন সৈন্যদের প্রাণহানি এড়াতেই মানবতার খাতিরে এই চরম পদক্ষেপ নিতে হয়েছে।

কিন্তু সমসাময়িক নথিপত্র এবং খোদ মার্কিন সামরিক বাহিনীর শীর্ষস্থানীয় সেনানায়কদের পরবর্তীকালের স্বীকারোক্তি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, হিরোশিমা ও নাগাসাকির ঘটনা আদৌ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ জয়ের কোনো অপরিহার্য সামরিক প্রয়োজন ছিল না; বরং এর পেছনে কাজ করেছিল যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে মার্কিন আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ভূ-রাজনৈতিক কৌশল। পরমাণু বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপের রণাঙ্গনে পতনশীল জার্মানির রাজধানী বার্লিনে সোভিয়েত পতাকা উত্তোলনের পরেই আমেরিকা জাপানে পরমাণু বোমা ফেলার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। কারণ ইতিমধ্যে সোভিয়েত রাশিয়া জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল এবং মানচুরিয়া অঞ্চলে জাপানি সেনাবাহিনীকে পরাস্ত করে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছিল। বার্লিনে বিজয়ের পর সেখানে সোভিয়েত রাশিয়া, ব্রিটেন এবং আমেরিকা—এই তিন মিত্রশক্তিরই পতাকা উত্তোলিত হয়েছিল; কিন্তু প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সোভিয়েত প্রভাব খর্ব করতে আমেরিকা চেয়েছিল টোকিওতে যেন সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। বস্তুত, পরমাণু বোমা নিক্ষেপের মাধ্যমে জাপানের একক আত্মসমর্পণ আদায় করে টোকিওতে শেষ পর্যন্ত কেবল মার্কিন পতাকাই ওড়ানো হয়েছিল।

এমনকি খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের সচেতন নাগরিক সমাজ ও বুদ্ধিজীবী মহল সেদিন এই অমানবিক হত্যাকাণ্ডকে বিনা প্রশ্নে মেনে নেয়নি। ১৯৪৫ সালেই প্রকাশিত ডোনাল্ড পিটার গেডেস (Donald Porter Geddes) সম্পাদিত প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘দ্য অ্যাটমিক এজ ওপেনস’ (The Atomic Age Opens)-এর ৪৫ পৃষ্ঠার বিবরণ থেকে তৎকালীন পাশ্চাত্য সমাজের তীব্র নৈতিক প্রতিক্রিয়ার পরিচয় পাওয়া যায়। গ্রন্থটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বত্র সাধারণ মানুষ ও শত শত বুদ্ধিজীবী তাঁদের স্থানীয় সংবাদপত্রের সম্পাদকদের কাছে চিঠি লিখে জাপানে নিরীহ অসামরিক নাগরিকদের এই গণহত্যার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন এবং একে নৈতিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ও অমানবিক কাজ বলে অভিহিত করেছিলেন। ব্রিটেনেও পরমাণু বোমা নিক্ষেপের সংবাদ অন্য সমস্ত খবরকে ছাপিয়ে যায় এবং ব্রিটিশ সংবাদপত্রের চিঠিপত্রের কলামগুলো ‘ইন দ্য নেম অফ হিউম্যানিটি’ (In the name of humanity) বা মানবতার দোহাই দিয়ে এই প্রশ্ন তোলে যে, সভ্যতার নামে আমরা আসলে কোন ধ্বংসের পথে এগিয়ে চলেছি।

সামরিক দিক থেকেও এই বোমা নিক্ষেপ যে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় ছিল, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দুই সর্বোচ্চ মার্কিন সেনানায়কের আত্মজীবনীতে। দক্ষিণ-পশ্চিম প্যাসিফিক এবং জাপান অঞ্চলের সুপ্রিম কমান্ডার জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থার (General Douglas MacArthur) পরবর্তীকালে তাঁর আত্মচরিতে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্বীকার করেছেন যে, তাঁর সাথে কোনোপ্রকার পরামর্শ না করেই জাপানে পরমাণু বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছিল এবং সামরিকভাবে এর কোনো প্রয়োজনই ছিল না। জেনারেল ম্যাকআর্থারের নিজের কথায়, তাঁর অধীনস্থ সামরিক কর্মকর্তারা সর্বসম্মতভাবে নিশ্চিত ছিলেন যে জাপান তখন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে এবং আত্মসমর্পণের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে; এমনকি তিনি কোনো অতিরিক্ত সামরিক অভিযান ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে জাপান অধিগ্রহণের (Peaceful occupation of Japan) পরিকল্পনা প্রস্তুত করার নির্দেশও দিয়েছিলেন। অর্থাৎ জাপান যখন আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে কেবলমাত্র পরমাণু অস্ত্রের ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্যই এই বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।

একইভাবে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালে ইউরোপে মিত্রবাহিনীর সর্বোচ্চ সেনানায়ক এবং পরবর্তীকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ার (Dwight D. Eisenhower) তাঁর বিখ্যাত আত্মচরিত ‘ম্যান্ডেট ফর চেঞ্জ’ (Mandate for Change, 1953)-এ এই ঘটনার কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, পরাজিত জাপানের ওপর পরমাণু বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো ছিল সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়; কারণ মার্কিন সৈন্যদের জীবন বাঁচানোর জন্য এই অস্ত্রের ব্যবহার আর কোনো বাধ্যতামূলক পদক্ষেপ ছিল না এবং এমন এক ভয়াবহ মারণাস্ত্র ব্যবহার করে বিশ্বজনমতকে আতঙ্কিত করা থেকে আমেরিকার বিরত থাকা উচিত ছিল।

কিন্তু জেনারেল ম্যাকআর্থার বা আইজেনহাওয়ারের মতো সমরনায়কেরা যুদ্ধ-পরবর্তীকালে মার্কিন প্রশাসনের এই নৈতিক অপরাধ স্বীকার করে নিলেও, মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন সেই পথে হাঁটেনি। উল্টে পেন্টাগন বিশ্বজুড়ে মার্কিন সামরিক একাধিপত্য বজায় রাখার লক্ষ্যে নতুন উদ্যমে পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণ এবং মজুত করার নির্দেশ জারি করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা পারমাণবিক অস্ত্র মজুত ও প্ররোচনার প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বজুড়ে শুরু হয় ‘ঠান্ডা যুদ্ধ’ (Cold War)। আত্মরক্ষা এবং শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখার তাগিদে বিশ্বের অন্যান্য উন্নত রাষ্ট্রগুলোও দ্রুত পরমাণু বোমা, দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং জলের নিচে চলাচলকারী পারমাণবিক ডুবোজাহাজ নির্মাণের প্রতিযোগিতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের (১৯৪৫) পর তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৪৯ সালে, ব্রিটেন ১৯৫২ সালে, ফ্রান্স ১৯৬০ সালে এবং এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে চীন ১৯৬৪ সালে পরীক্ষামূলক পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিজেদের পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার গড়ে তোলে। এভাবেই একদিকে আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও কানাডা এবং অন্যদিকে সোভিয়েত রাশিয়া ও চীনকে কেন্দ্র করে বিশ্ব রাজনীতিতে একচেটিয়া আধিপত্যবাদী ‘নিউক্লিয়ার ক্লাব’ (Nuclear Club) আত্মপ্রকাশ করে।

১.৪ ভারতীয় নেতৃত্বের প্রাথমিক দর্শন ও শান্তিপূর্ণ পরমাণু চর্চার অঙ্গীকার

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি এবং ঠান্ডা যুদ্ধের এই উত্তপ্ত সূচনালগ্নেই ১৯৪৭ সালে ভারত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। সদ্য স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রনেতারা যখন দেশের ভবিষ্যৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনীতির রূপরেখা তৈরি করছিলেন, তখন তাঁদের সামনে পরমাণু শক্তির দুটি বিপরীতমুখী চিত্র স্পষ্ট ছিল। ১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট হিরোশিমা ও নাগাসাকির মর্মান্তিক মানবিক বিপর্যয় তৎকালীন ভারতীয় রাষ্ট্রনেতাদের মনে পরমাণু বোমা তৈরির ক্ষেত্রে এক গভীর মানসিক ও নৈতিক বাধা সৃষ্টি করেছিল। যুদ্ধবাজ রাজনীতির প্রভাবে লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষের মৃত্যু এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা তেজস্ক্রিয় পঙ্গুত্বের বিভীষিকা বিচার করে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু পরমাণু মারণাস্ত্রের বিরুদ্ধে অত্যন্ত জোরালো অবস্থান গ্রহণ করেন।

তবে পরমাণু বোমার বিরোধিতা করার অর্থ এই ছিল না যে ভারত আধুনিক পরমাণু বিজ্ঞান চর্চা থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখবে। ভারত স্বাধীনতা লাভের আগে থেকেই পণ্ডিত নেহরু দেশের দারিদ্র্য বিমোচন ও আধুনিকীকরণের জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার উন্নতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে এসেছিলেন। বিভিন্ন সভা-সমিতিতে দেওয়া ভাষণে তিনি পরমাণু শক্তির ধ্বংসাত্মক দিকটির বিরুদ্ধে যেমন বিশ্ববিবেককে সচেতন করেছিলেন, তেমনই এর গঠনমূলক প্রক্রিয়া সম্পর্কেও জাতিকে সুস্পষ্ট দিশা নির্দেশ দিয়েছিলেন। নেহরুর দর্শন ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট—উপনিবেশ-উত্তর ভারতের মূল লড়াই হলো অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা, বিদ্যুৎ সংকট এবং দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে; তাই মারণাস্ত্র নির্মাণের অর্থহীন প্রতিযোগিতায় জাতীয় সম্পদ অপচয় না করে কেবলমাত্র অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন, কৃষি ও চিকিৎসার তাগিদে পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

পণ্ডিত নেহরুর এই গঠনমূলক দর্শনের সাথে ভারতে পরমাণু শক্তি চর্চার জনক ড. হোমি জাহাঙ্গীর ভাবার বৈজ্ঞানিক দূরদর্শিতার এক চমৎকার মেলবন্ধন ঘটেছিল। ১৯৪৪ সালে—অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পরমাণু বোমার প্রথম পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটানোরও এক বছর আগে—বিজ্ঞানী ভাবা ভারতে একটি অত্যাধুনিক পারমাণবিক গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে টাটা গোষ্ঠীর সাথে আলোচনা শুরু করেছিলেন। ড. ভাবা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, ভারতে অত্যন্ত দক্ষ এবং কুশলী বিজ্ঞানীরা রয়েছেন এবং ধ্বংসাত্মক কাজে পরমাণু প্রযুক্তি ব্যবহার না করেও কেবলমাত্র শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পায়নের প্রভূত উন্নতির জন্য এই প্রযুক্তিকে সফলভাবে ব্যবহার করা সম্ভব।

এই ঐতিহাসিক ও নৈতিক প্রেক্ষাপটেই ভারতে পরমাণু গবেষণার যাত্রা শুরু হয়, যেখানে শুরু থেকেই পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারই সর্বোচ্চ প্রাধান্য পেয়েছিল। ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭৪ সালের প্রথম পোখরান বিস্ফোরণের পূর্ববর্তী সময়কাল পর্যন্ত ভারতীয় বিজ্ঞানীরা কেবল মারণাস্ত্র বা পরমাণু বোমা তৈরির উগ্র কৌতূহলে পরিচালিত হননি। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণ, ইউরেনিয়াম ও থোরিয়াম জ্বালানির গবেষণা এবং মৌলিক পদার্থবিদ্যার নিরবচ্ছিন্ন চর্চার মাধ্যমে ভারতীয় বিজ্ঞানীরা গোপনীয়তা বজায় রেখে এমন এক উচ্চমানের দেশীয় প্রযুক্তিগত ভিত্তি ও কারিগরি দক্ষতা অর্জন করেছিলেন, যা পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক চাপের মুখে ভারতকে এক সম্পূর্ণ স্বনির্ভর পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র এবং ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রযুক্তির অধিকারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সাহায্য করেছিল।


প্রকৃতির জন্য -
Tushar Gorai
July 14, 2025 | পরিবেশ | views:523 | likes:6 | share: 4 | comments:0

বর্তমানে আমরা এমন এক যুগে বাস করি যেখানে দিন-প্রতিদিন আমরা যন্ত্রনির্ভরশীল হয়ে উঠছি । সকালবেলা মোবাইলের অ্যালার্ম শুনে ঘুম থেকে ওঠা এবং চটপট নোটিফিকেশন খুঁজে নেওয়া আমাদের প্রাত্যহিক অভ্যাস হয়ে উঠেছে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ দিয়ে তৈরি মোবাইলে আমরা গোটা পৃথিবীকে খুঁজে বেড়াই। সত্যিই কি আমরা খুঁজে পাই? 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিত্যনতুন কান্ডকারখানার হাজারো ঘটনা আমরা দেখছি। সত্যিই কত  কি করে ফেলা সম্ভব সহজ উপায়ে। যে কোন প্রশ্ন করলে চটজলদি উত্তর দিয়ে দেয়। অংক কষতেও পারে। হাজার হাজার বছর ধরে কঠোর পরিশ্রমের জ্ঞান-বিজ্ঞান কত কম সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা রপ্ত করে নিয়েছে। তাহলে মানুষের আর কি কোন প্রয়োজন নেই? যন্ত্র দিয়ে চলবে আমাদের জীবন আর বিশ্ব। এই কি আমাদের কাছে কঠোর বাস্তব। যেভাবে আমরা বছরের পর বছর হেয় করে এসেছি আমাদের মাতৃসম প্রকৃতিকে সেভাবেই কি যন্ত্রও একদিন আমাদের সাথে অপব্যবহার করবে। 

বর্তমানে প্রকৃতি তার স্বচ্ছন্দ হারিয়েছে। মানুষের কার্যকলাপের ফলে প্রকৃতির নিয়ম বিঘ্নিত হয়েছে এবং তার ফলস্বরুপ প্রকৃতি আমাদের ওপর অনিয়মিতভাবে প্রতিক্রিয়া করেছে। সমুদ্রের জলতল বৃদ্ধি হওয়ার ফলে দ্বীপ সংলগ্ন এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গাছ কাটার জন্য বাস্তুতন্ত্র ভারসাম্য হারিয়েছে। কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ, জলচক্র, অক্সিজেন উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। জল দূষণ, বায়ু দূষণ, মাটি দূষণ গল্প-কবিতার রহস্যময়ী, মনোরম  পরিবেশকে ধ্বংস করে বিষিয়ে দিয়েছে। বিশ্বাস উষ্ণায়ন আজ চরম অবস্থায় আমাদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। সকল প্রাণীকুল এর প্রভাবের মধ্যে। মনুষ্যসৃষ্ট কারণের জন্যে জনজীবন এবং সকল প্রাণীকুল আজ বিপন্ন। 

মানুষ কত কি না পারে। চারিদিকে যতো দেখি তত অবাক হয়ে যাই বড় বড় ইমারৎ, অত্যাধুনিক যন্ত্র, যুদ্ধাস্ত্র, শিল্প - সংস্কৃতি আরো কত সব সৃষ্টি তার। তবে আমরা কি পারিনা সুন্দর পৃথিবীটাকে পুনর্বাসন দিতে?

চলো আমরা সবে এক হয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই প্রকৃতির জন্য। 



মিশরে লিপ ইয়ার -
Tushar Gorai
March 18, 2025 | বিজ্ঞানমনস্কতা | views:72 | likes:0 | share: 1 | comments:0

পুরাতত্ত্ববিদদের অনুমান আনুমানিক ৪২৩৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মিশরীয়রা চন্দ্র মাসের ভিত্তিতে বছরের হিসেব রাখতে শুরু করে। নীল নদের বন্যার পূর্বাভাস দিতে ব্যর্থ হয় এ পদ্ধতি। খ্রিস্টপূর্বাব্দ ২০০০ অব্দে সৌর বছরের প্রবর্তন হয় মিশরীয় পঞ্জিকায়। নীল নদের প্রথম বন্যার আগমন কাল  বর্তমানের জুন মাস কে ধরেছিল তারা। এই সময় আকাশে লুব্ধক(Sirius) নক্ষত্রের আবির্ভাব হতো এর থেকে তারা নতুন বছর গণনা শুরু করে। মিশরীয়রা সৌর বছর গণনা করত ৩৬৫ দিনে। ৩০ দিনে এক মাস এবং ১২ মাসে এক বছর হিসেবে সৌরবছর গণনা করতো তারা। বছরের শেষে আরো পাঁচ দিন যুক্ত করে বিভিন্ন দেবদেবীর পূজা অর্চনা করত। চার বছর অন্তর ৫ দিনের বদলে ৬ দিন যুক্ত করে তারা পঞ্জিকা তৈরি করত কারণ মিশরের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ৩৬৫ ১/৪ দিনে এক বছর হয় সেটা তারা ধরতে পেরেছিলেন। আধুনিক লিপ ইয়ার মিশরীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও গণিতজ্ঞদের আবিষ্কার। 



জলাভূমি সংরক্ষণ: এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ -
Tushar Gorai
Feb. 2, 2025 | বিজ্ঞানমনস্কতা | views:118 | likes:0 | share: 2 | comments:0



জলাভূমি, প্রাকৃতিক হোক বা কৃত্রিম, আমাদের দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে একটি। পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক দিক থেকে এগুলোর গুরুত্ব অসীম। তবে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, নগরায়ন, কৃষি সম্প্রসারণ, কঠিন বর্জ্য ফেলা এবং শিল্পায়নের ফলে এই মূল্যবান অঞ্চলগুলির অবক্ষয় ঘটছে। জলাভূমির জাতীয় গুরুত্ব উপলব্ধি করে, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এগুলোর সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য বহু-মাত্রিক প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছে।  


জলাভূমি পৃথিবীর অন্যতম উর্বর বাস্তুতন্ত্র এবং এটি জীববৈচিত্র্য রক্ষা, জলচক্র নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন প্রজাতির জীবের আবাসস্থল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ ধরনের পরিবেশ পানিশোধন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং জলসম্পদের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা করে। পাশাপাশি, জলাভূমি মৎস্যচাষ, কৃষিকাজ এবং পর্যটনের মাধ্যমে অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। জলাভূমির এই বহুমুখী উপকারিতা সত্ত্বেও, মানুষের অসচেতনতা এবং অব্যবস্থাপনার ফলে এটি ক্রমাগত ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।  


নগরায়ন ও শিল্পায়নের ফলে জলাভূমিগুলি দখল ও দূষণের শিকার হচ্ছে, যেখানে অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ কার্যক্রম এবং শিল্প বর্জ্য নিঃসরণ সরাসরি জলাভূমির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কৃষি সম্প্রসারণের কারণে জলাভূমিগুলিকে কৃষিজমিতে রূপান্তর করা হচ্ছে, যার ফলে প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হচ্ছে এবং জলচক্র ব্যাহত হচ্ছে। এর পাশাপাশি কঠিন বর্জ্য ফেলার প্রবণতা জলাভূমির স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট করে এবং পানির গুণমান হ্রাস করে, যা বিভিন্ন জলজ প্রাণীর জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করে।  


এই সংকট মোকাবিলায় জলাভূমি সংরক্ষণের জন্য কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যাতে তারা জলাভূমির উপকারিতা সম্পর্কে অবগত হয় এবং সংরক্ষণের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারে। কঠোর পরিবেশগত আইন ও নীতিমালা কার্যকর করে জলাভূমি সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, যাতে অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ন ও শিল্প দূষণ প্রতিরোধ করা যায়। স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা হলে সংরক্ষণ প্রচেষ্টা আরও কার্যকর হবে, কারণ তারাই সরাসরি জলাভূমির উপর নির্ভরশীল। বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে জলাভূমির পরিবেশগত কার্যকারিতা বোঝা এবং টেকসই ব্যবস্থাপনার কৌশল বিকাশ করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত জলাভূমিগুলির পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়।  


জলাভূমি আমাদের পরিবেশের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা অবিলম্বে সংরক্ষণের জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। যদি আমরা সচেতনভাবে জলাভূমিগুলি রক্ষা করতে না পারি, তাহলে এটি ভবিষ্যতের জন্য হুমকিস্বরূপ হতে পারে। জলাভূমির গুরুত্ব অনুধাবন করে, যথাযথ নীতিমালা প্রয়োগ, জনগণের সম্পৃক্ততা এবং বিজ্ঞানসম্মত সংরক্ষণ পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমে আমরা জলাভূমির টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই মূল্যবান বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণে আমাদের সক্রিয় ভূমিকা রাখা উচিত।

গ্রিন টেকনোলজি: ভবিষ্যতের পথ -
Tushar Gorai
Jan. 31, 2025 | টেকনোলজি | views:243 | likes:0 | share: 1 | comments:0



গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন, প্রাকৃতিক সম্পদের হ্রাস, এবং ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবের কারণে, গত দুই দশক ধরে  দূষণমুক্ত ও পরিবেশবান্ধব  প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদের বাস্তবায়ন নিয়ে চিন্তাভাবনা করছেন। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি বলতে প্রচলিত শক্তি সম্পদ ব্যবহার করে শক্তির চাহিদা মেটানো বোঝায়, যা পরিবেশের ক্ষতি করে না এবং গ্রীন টেকনোলজি বলতে পরিবেশবান্ধব পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎসের ব্যবহার বোঝায়।



গ্রীন টেকনোলজির ধারণা হল এমন পণ্য, সিস্টেম এবং কাঠামোর সৃষ্টি এবং প্রয়োগ যা প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং এর বৈশিষ্ট্যগুলি রক্ষা করার লক্ষ্য রাখে। সহজভাবে বলতে গেলে, "গ্রীন টেকনোলজি" বলতে এমন ডিভাইস, পরিষেবা বা প্রক্রিয়া বোঝায় যা খুব কম বা কোনো গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন করে না, ব্যবহার করা নিরাপদ এবং সমস্ত জীবনের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর জলবায়ু উৎসাহিত ভিত্তিস্থাপন করে। 


গ্রীন টেকনোলজি বিভিন্ন উদ্ভাবনকে অন্তর্ভুক্ত করে যা পরিবেশের উন্নতি এবং সম্পদের দক্ষতার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। এগুলি মূলত পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎপাদন যেমন সৌর এবং বায়ু শক্তি থেকে শুরু করে উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সমাধান। এই প্রযুক্তিগুলি জলবায়ু পরিবর্তন এবং সম্পদের অভাবের মতো বৈশ্বিক পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা প্রচলিত অনুশীলন থেকে উন্নত বিকল্পগুলিতে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নির্দেশ করে।


এই প্রযুক্তির সুযোগগুলি বিশাল। অর্থনৈতিকভাবে, তারা নতুন বাজার খুলে দেয় এবং চাকরি তৈরি করে। এই প্রযুক্তিগুলি ব্যবসায়িক উদ্ভাবনকেও উৎসাহিত করে, কোম্পানিগুলিকে নতুন পণ্য এবং পরিষেবা বিকাশ করতে সক্ষম করে যার জন্য ক্রমবর্ধমান ভোক্তার চাহিদা পূরণ করে। পরিবেশগতভাবে, সবুজ প্রযুক্তি কার্বন নির্গমন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশগত অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবদান রাখে। সামাজিকভাবে, তারা জীবনের গুণমান উন্নত করে এবং একটি  ন্যায়সঙ্গত বিশ্বের দিকে একটি পদক্ষেপ হিসাবে কাজ করে।


 ভবিষ্যত শুধুমাত্র নতুন গ্যাজেট এবং সমাধান সম্পর্কে নয়; এটি আরও সহজ - সরল জীবনযাপনের দিকে মানসিকতার পরিবর্তন সম্পর্কে। ভারতের ক্রমাগত বিকশিত নীতিমালা এবং সংস্কারগুলি ব্যবসা করার সহজতা এবং জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদানের লক্ষ্য অর্জনের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে সবুজ প্রযুক্তির দ্রুত গ্রহণের জন্য একটি পথ পরিষ্কার করছে এবং বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের সুবিধা প্রদান করছে। ভারতের 'আস্পিরেশনাল ডিস্ট্রিক্ট প্রোগ্রাম' স্থানীয় সম্প্রদায়গুলিকে কাজে লাগিয়ে এমন একটি রূপান্তর চ্যানেল করার জন্য সেরা উদ্যোগ, কারণ এটি উন্নয়নের আঞ্চলিক বৈচিত্র্যের মধ্যে বৈষম্য দূর করে। এই প্রোগ্রামটি, এর শক্তি রূপান্তরের বর্ধিত সুযোগ সহ, ভারতের পরিবেশবান্ধব শক্তির বিপ্লবের জন্য একটি বাতিঘর হিসাবে কাজ করে এবং বিশ্বব্যাপী পুনরাবৃত্তিযোগ্য একটি মডেল প্রদান করে।



অস্ট্রেলিয়ান গ্রিনসের সেনেটর বব ব্রাউনের কথাগুলি মনে রাখতে হবে: "ভবিষ্যত হয় সবুজ হবে, নয়তো কিছুই হবে না।"

পরিবেশ ভাবনায় - বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর -
Tushar Gorai
Jan. 20, 2025 | পরিবেশ | views:251 | likes:5 | share: 5 | comments:0

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যকার সুষম সম্পর্ক স্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃতি মানুষের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং প্রকৃতির সঙ্গে সমন্বয় সাধন ব্যতীত মানুষের পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাঁর এই বিশ্বাসের প্রতিফলন আমরা পাই শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতনের প্রতিষ্ঠায়।

শান্তিনিকেতন
শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ পরিবেশবান্ধব শিক্ষার একটি নতুন মডেল তৈরি করেন। তাঁর মতে, প্রকৃতির কাছাকাছি থাকলে শিক্ষার্থীরা কেবল পঠনপাঠনেই নয়, বরং তাদের নৈতিক ও সৃজনশীল বিকাশেও অগ্রগামী হবে। শান্তিনিকেতনে শিক্ষার্থীরা মুক্ত আকাশের নীচে প্রকৃতির কোলে পাঠ গ্রহণ করত। তিনি মনে করতেন, প্রকৃতির সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করলে শিক্ষার্থীদের কল্পনাশক্তি বৃদ্ধি পায় এবং তারা জীবন সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়।

শ্রীনিকেতন
শ্রীনিকেতনের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ গ্রামীণ জীবনের উন্নয়নে মনোনিবেশ করেন। তিনি গ্রামীণ সমাজের উন্নয়ন, কৃষি আধুনিকীকরণ, এবং স্বনির্ভরশীলতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন। কৃষকদের জীবনের মানোন্নয়নে তিনি আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও পদ্ধতির প্রচলন ঘটান। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল গ্রামগুলোকে শক্তিশালী করে তোলা, যাতে তারা শহরের উপর নির্ভরশীল না হয়।

বৃক্ষরোপণ উৎসব ও পরিবেশ সচেতনতা
রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ককে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি ১৯২৫ সালে শান্তিনিকেতনে প্রথম বৃক্ষরোপণ উৎসবের সূচনা করেন। এই উৎসবের মাধ্যমে তিনি মানুষকে প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল হতে উদ্বুদ্ধ করেন। বৃক্ষরোপণ শুধু পরিবেশ সংরক্ষণের উপায়ই নয়, এটি প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে মজবুত করার একটি প্রতীকী পদক্ষেপ।

লেখনীতে পরিবেশ ভাবনা
রবীন্দ্রনাথ তাঁর সাহিত্য ও বক্তৃতার মাধ্যমে শহর ও গ্রামের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তিনি শহরের অতি-বাণিজ্যিকীকরণ এবং প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্নতার বিরোধিতা করেছেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ জাপান যাত্রীতে তিনি উল্লেখ করেছেন, "পৃথিবীর শহরগুলো প্রকৃতি ও মমতার মিলনে তৈরি হওয়া উচিত। কিন্তু বাণিজ্যিক চাহিদার কারণে শহরগুলো মানবিক সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলছে।"

আধুনিক প্রাসঙ্গিকতা
বর্তমান পরিবেশ সংকটের প্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয়ের ফলে যে সংকট দেখা দিয়েছে, তা মোকাবিলায় তাঁর দর্শন আমাদের দিকনির্দেশনা দিতে পারে। তাঁর বিশ্বাস ছিল, প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলে মানুষ সঠিক পথে অগ্রসর হতে পারবে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই পরিবেশ ভাবনা কেবল তাঁর সময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি সর্বজনীন এবং চিরন্তন। তাঁর শিক্ষাব্যবস্থা, গ্রামীণ উন্নয়ন ও পরিবেশ সচেতনতা আজও আমাদের জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস ।

তথ্যসূত্র:

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবেশ ভাবনা


শরৎ সাহিত্যে ধর্ম ও সংস্কার -
Tushar Gorai
Jan. 17, 2025 | জীবনী | views:347 | likes:3 | share: 6 | comments:0

স্বামী বিবেকানন্দের বেদান্ত দর্শন ভারতের জনমানসে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে বরাবরই। তবে শরৎসাহিত্যে বেদান্ত দর্শনের প্রবল বিরোধিতা লক্ষ করা যায় এমনকি ঈশ্বরকেও তিনি বিদ্রুপ করেছেন। এমন কাজ তিনি করে দেখিয়েছেন যখন হিন্দু সমাজের বাঁধন বেশ শক্ত ছিল। তখন হিন্দু সমাজ পুরোপুরি ধর্মীয় প্রভাবে আচ্ছন্ন ছিল। এমতাবস্থায় তিনি লিখছেন ," কোনো  ধর্মগ্রন্থই কখনও অভ্রান্ত সত্য হতে পারে না। বেদও ধর্মগ্রন্থ। সুতরাং, এতেও মিথ্যার অভাব নেই। যা বুদ্ধির বাইরে, তাকে বুদ্ধির বাইরে বলেই ত্যাগ করব। মুখে বলব, অব্যক্ত , অবোধ্য, অজ্ঞেয় , আর বাজে কথায় তাকেই ক্রমাগত বলবার চেষ্টা , জানবার চেষ্টা কিছুতেই করবো না। যিনি করবেন তাকেও কোনো মতে সহ্য করবো না "। ঠাট্টা করে তিনি বলছেন , " ... নির্গুণ নিরাকার, নির্লিপ্ত, নির্বিকার এসব কেবল কথার কথা। এর কোনো মানে নেই। যে মুখে বলছেন জানা যায় না, সেই মুখেই আবার এত কথা বলছেন যেন এইমাত্র সমস্ত স্বচক্ষে দেখে এলেন। যাকে কোন মতেই উপলব্ধি করা যায় না, তাকেই উপলব্ধি করবার জন্য পাতার পর পাতা, ব‌ইয়ের পর বই লিখে যাচ্ছেন। কেন? "  ইতিহাসকে কেউ যদি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ঘেটে দেখেন তবেই তার সামনে আসল সত্যটা উন্মোচন হবে। তার লেখা 'চরিত্রহীন' বইতে উপনিষদ সম্পর্কে খুব সুন্দর করে ছোট্ট কথার মধ্যে  তীব্র বিদ্রুপ করেছেন। দিবাকর ও কিরণময়ীর আলোচনার মধ্যে দিয়ে উপনিষদ সম্পর্কে বিভিন্ন প্রকার যুক্তি-তর্ক দেখা যায়। শরৎচন্দ্র এর মধ্যে দিয়ে বোঝাতে চাইছিলেন যা সত্য তাকে সকল সময় সকল অবস্থায় গ্রহণ করা প্রয়োজন ,এতে বেদই মিথ্যা হোক আর শাস্ত্রই মিথ্যা হয়ে যাক , সত্যের চেয়ে বড় কিছু নয়। বর্তমানে মানুষের তর্কের ঝোঁক এতটাই বেশি যে সহজ সরল যুক্তিগুলোকে মানুষ উপেক্ষা করে দেয়। তিনি এই বিষয়টিকে তার লেখনীর মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন সেখানে ‌।

শরৎচন্দ্র তার সাহিত্যের মাধ্যমে ভারতীয় সমাজে জাতপাতের সমস্যা গুলিকে মুক্তির পথে অন্যতম বাধা হিসেবে প্রস্ফুটিত করতে চেয়েছিলেন। কোন একটি অভ্যাস সেটা সমষ্টির মেনে চলার মাধ্যমে তা সংস্কারে পরিণত হয়। সংস্কার যদি আমাদের গুণাবলী ,মহত্ব ,দায়িত্ববোধ, কর্তব্যবোধ এবং মনুষ্যত্ববোধকে ক্ষুন্ন করে তাহলে তা কোনমতেই সংস্কার নয়, তা একটি কুসংস্কার। 'গৃহদাহ'- এ রাম বাবু চরিত্রের মধ্য দিয়ে এবং বহু জায়গায় বহু চরিত্রের মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন যে হিন্দু সমাজে জাত পাতের সমস্যাটা সবসময় মোটা অর্থে নিচুতার সঙ্গে জড়িয়ে নেই। তা করুণা মহৎ গুণ, মমতা, ভালবাসার সঙ্গেও জড়িয়ে থাকে। মহিমের ভাষায়, " যে ধর্ম অত্যাচারের আঘাত থেকে নিজেকে এবং অপরকে রক্ষা করিতে পারেনা ,বরঞ্চ তাহাকে মৃত্যু হইতে বাঁচাইতে সমস্ত শক্তি অহরহ উদ্যত রাখিতে হয়, সে কিসের ধর্ম মানব জীবনে তার প্রয়োজনীয়তা কোনখানে ? " শরৎচন্দ্র মানুষের চিন্তা চেতনায় ব্যথা বেদনা জাগিয়ে ধর্ম এবং সংস্কারকে আঘাত করেছেন। 


কার্বন ক্যাপচার: পরিবেশ কল্যাণমূলক এক অভিনব প্রক্রিয়া -
Tushar Gorai
Jan. 13, 2025 | বিজ্ঞানমনস্কতা | views:131 | likes:4 | share: 5 | comments:0

সাধারণ ব্যাকটেরিয়া থেকে জটিল উদ্ভিদ ও প্রাণী, সকল জীবের গঠনমূলক উপাদান হলো কার্বন। এটি বাস্তুতন্ত্রের কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, কারণ এটি খাদ্য শৃঙ্খলার ভিত্তি গড়ে তোলে এবং বিভিন্ন প্রজাতির জন্য আবাসস্থল ও সম্পদ সরবরাহের মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য বজায় রাখে।  

তবে, কার্বন ডাই অক্সাইড একটি গ্রিনহাউস গ্যাস যা পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে বিকিরিত তাপ আটকে রাখে। মানব কার্যকলাপ, যেমন জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, বন উজাড় এবং অতিরিক্ত জমি অধিগ্রহণ, CO₂ স্তরকে বাড়িয়ে তুলেছে, যা গ্রিনহাউস প্রভাবের ভারসাম্য নষ্ট করেছে। এর ফলে সাগরের স্তর বৃদ্ধি, বরফ গলে যাওয়া, মানব স্বাস্থ্য, বায়ুর গুণমান এবং খাদ্য ও পানির নিরাপত্তার উপর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।  

কার্বন ক্যাপচার ও সংরক্ষণ (CCUS)  :

কার্বন ক্যাপচার এবং সংরক্ষণ প্রযুক্তি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি শিল্প হাব থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ ধরে রাখতে এবং নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবস্থার সাথে সংযোগ স্থাপন করতে সাহায্য করে।  

কার্বন ক্যাপচারের প্রকারভেদ :

1. পোস্ট-কমবাস্টন ক্যাপচার: জ্বালানি পোড়ানোর পরে বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা শিল্প প্ল্যান্ট থেকে নির্গত গ্যাস থেকে CO₂ সংগ্রহ।  

2. প্রি-কমবাস্টন ক্যাপচার: জ্বালানি পোড়ানোর আগে CO₂ সংগ্রহ করা হয়, যা সাধারণত IGCC (ইন্টিগ্রেটেড গ্যাসিফিকেশন কম্বাইন্ড সাইকেল) প্ল্যান্টে ব্যবহৃত হয়।  

3. অক্সি-ফুয়েল কমবাস্টন: বাতাসের পরিবর্তে বিশুদ্ধ অক্সিজেন দিয়ে জ্বালানি পোড়ানো, যা প্রধানত CO₂ এবং জলীয় বাষ্প তৈরি করে।  


সংগৃহীত CO₂ এর সংরক্ষণ :

সংগৃহীত CO₂ গভীর ভূগর্ভস্থ গঠনে সংরক্ষণ করা হয়, যেমন:  

- তৈল ও গ্যাসের শূন্যক্ষেত্র: আগের ব্যবহৃত তেল ও গ্যাসের রিজার্ভ।  

- লবণাক্ত অ্যাকুইফার: লবণাক্ত পানিযুক্ত ভূগর্ভস্থ শিলা স্তর।  

- অখননযোগ্য কয়লার স্তর: গভীর বা ব্যয়বহুল কয়লা স্তর।  


CCUS-এর সুবিধাসমূহ : 

- গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস: CO₂ সংরক্ষণের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন রোধ।  

- জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার অব্যাহত রাখা: পরিবেশগত প্রভাব কমিয়ে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার চালিয়ে যাওয়া।  

- অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি: নতুন চাকরি এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সৃষ্টি।  

চ্যালেঞ্জ এবং বিবেচনা :

- উচ্চ খরচ: CO₂ সংগ্রহ, পরিবহন এবং সংরক্ষণের জন্য ব্যয়বহুল।  

- পরিবেশগত ঝুঁকি: ভূগর্ভস্থ CO₂ সংরক্ষণে লিকেজ এবং ভূমিকম্পের সম্ভাবনা।  

- প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা: বড় আকারে বাস্তবায়নে প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ।  


ভারত ও বিশ্বের কার্বন ক্যাপচার প্রকল্প :

বিশ্বে:  

- পেট্রা নোভা (যুক্তরাষ্ট্র): কয়লা-চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে CO₂ সংগ্রহ করে ভূগর্ভস্থ সংরক্ষণ।  

- গর্গন (অস্ট্রেলিয়া): প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন থেকে CO₂ সংগ্রহ এবং সমুদ্রের গভীরে সংরক্ষণ।  

- স্লেইপনার (নরওয়ে): প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন থেকে CO₂ সংগ্রহ এবং লবণাক্ত অ্যাকুইফারে সংরক্ষণ।  

- বাউন্ডারি ড্যাম (কানাডা): কয়লা-চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে CO₂ সংগ্রহ করে ভূগর্ভস্থ সংরক্ষণ।  

- নর্দার্ন লাইটস (নরওয়ে): পূর্ণাঙ্গ CCS শৃঙ্খল তৈরির প্রকল্প।  

ভারতে:  

- ONGC-এর CO₂ ক্যাপচার এবং ব্যবহার: তেল ক্ষেত্র থেকে CO₂ সংগ্রহ এবং উন্নত তেল উৎপাদনে ব্যবহার।  

- কয়লা-চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলিতে কার্বন ক্যাপচার: পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে প্রযুক্তি পরীক্ষা।  

ভারতে কার্বন ক্যাপচার প্রকল্প সীমিত হলেও, ক্লিন এনার্জি এবং জলবায়ু ক্রিয়ার উপর সরকারের মনোযোগ এই খাতের উন্নয়ন সম্ভাবনা বৃদ্ধি করেছে। নবায়নযোগ্য শক্তির সাথে কার্বন ক্যাপচার একত্রিত করা একটি টেকসই, কম কার্বন ভবিষ্যতের পথে অবদান রাখতে পারে।  



তথ্যসূত্র: Science Reporter (Feb,2024)


ইন্টারস্টেলার -
Tushar Gorai
Jan. 12, 2025 | বিজ্ঞানমনস্কতা | views:234 | likes:8 | share: 3 | comments:0

পদার্থবিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলি রূপোলি পর্দায় তুলে ধরা চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। 'বিজ্ঞান' এই শব্দটা শুনলেই মানুষের মধ্যে বিভিন্ন প্রকার জটিল থিওরি এবং ভয়ংকর ক্যালকুলেশনের  কথা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সাধারণ দর্শক রোমান্টিক বা একশন সিনেমা বেশিই দেখতে পছন্দ করেন। বৈজ্ঞানিক জটিল তত্ত্ব এবং জাগতিক বিভিন্ন রহস্যময় ঘটনার প্রতি মানুষের কৌতুহল যে একেবারে নেই তা নয়।

২০০৫ সালের অক্টোবর মাসে প্রডিউসার লিন্ডা অবস্ট কল্পবিজ্ঞান বিষয়ক একটি সিনেমা প্রস্তুত করার জন্য প্রস্তাব দিলেন বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী কিপ স্টিফেন থর্নকে। এই বিজ্ঞানী জীবনের অনেকটা সময় জুড়ে গবেষণা করেছেন ব্ল্যাক হোল, ওয়ার্ম হোল, গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ ইত্যাদি বিষয়ে। এই ক্ষেত্রে তার জ্ঞান ও দক্ষতা প্রশ্নাতীত। তিনি অবশ্য সিনেমা তৈরির সাথে যুক্ত হয়ে পড়বেন এ বিষয়ে তিনি কোনদিন কল্পনাও করেননি। 

পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলান এবং তার ভাই স্ক্রিপ্ট রচয়িতা জোনাথান নোলানের সঙ্গে ভিসুয়াল এফেক্টসে কাজ করার জন্য খুব একটা বেগ পেতে হয়নি থর্ণকে। পরবর্তীকালে তিনি 'সাইন্স অফ ইন্টারস্টেলার' বলে একটি বই লেখেন যার মুখবন্ধ লিখেছিলেন স্বয়ং পরিচালক নোলান। ইন্টারস্টেলার ছবিতে 'গারগানটুয়া' ব্ল্যাক হোলের আশেপাশে ঘুরতে ঘুরতে মহাকাশযান 'এনডিওরেন্স' যে দৃশ্য দেখতে পাচ্ছে সেগুলোকে শর্ট অনুযায়ী ব্যাখ্যা করেন । ছবির একটা জায়গায় তিনি গ্রাভিটেশনাল লেন্সিং বিষয়টিকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। মহাকাশে কোন ভারি বস্তুর পাশ দিয়ে আলো যাওয়ার সময় সেই ভারী বস্তুর মহাকর্ষের টানে আলোর বেঁকে যাওয়াকে গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং বলা হয়। অবশ্য পদার্থবিজ্ঞানীরা বলেন ভারী বস্তুর কারণে উঁচু-নিচু স্থান কালের ক্ষেত্রে আলো রশ্মি চলতে গিয়ে বেঁকে যাওয়াকে গ্রাভিটেশনাল লেন্সিং বলে। 'গারগানটুয়ার' স্পিনিং এর কারণে যে গ্রাভিটেশনাল লেন্সিং হয় যার ফলে তার প্রতিবিম্বের অবস্থান ভিন্ন ধরনের বোঝানোর জন্য ছবি এঁকে তার সঞ্চার পথ নির্দেশ করেছেন থর্ন। ব্ল্যাক হোল ঘিরে যে আক্ক্রিশন ডিস্ক থাকে তার প্রকৃত তাপমাত্রা লক্ষ লক্ষ ডিগ্রিতে পৌঁছতে পারে তাছাড়া এক্স রশ্মি, গামা রশ্মি, বেতার তরঙ্গ এবং দৃশ্যমান আলোর মত বিভিন্ন বিকিরণ ঘটে। ব্ল্যাক হোলের মধ্যে এই তাপমাত্রাকে বোঝানোর জন্য তাপমাত্রার সমানুপাতিক উজ্জ্বল্য কে ভিসুয়াল ইফেক্টসের সাহায্য নেওয়া হলো।  'গারগানটুয়ার ' থেকে প্রচুর পরিমাণে দৃশ্যমান আলো বেরিয়ে এলেও এক্স রশ্মি বা গামা রশ্মি বেরোয় না তাই আপাতভাবে সেই বিকিরণের আবহে নিশ্চিহ্ন হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না ছবির নায়ক কুপারের। গল্পে রসের মাধ্যমে বিজ্ঞান পরিবেশনায় বিস্ময়কর দক্ষতা দেখিয়েছেন বিজ্ঞানী থর্ন। সূক্ষ্মাতি-সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক নীতিগুলো মেনে তিনি তৈরি করেছেন সমস্ত ভিসুয়াল ইফেক্টস্। 

ব্যবসায়িক সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে অনেকেই এসব বৈজ্ঞানিক কঠিন তত্ত্বগুলি জনসমক্ষে তুলে ধরার জন্য এতটাও পরিশ্রম করেন না। তবে বিত্তশালী হলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে ক্রিস্টোফার নোলানের এর মত অনেক পরিচালকই এই ঝুঁকিটা নেন। জনসমক্ষে জ্যোতি:পদার্থবিদ্যার এই সব জটিল রহস্যজনক ঘটনা সর্বসমক্ষে আসার ফলে তাদের মধ্যে এক বিস্ময়কর কৌতূহলের সৃষ্টি হয়। সিনেমাই পারে মানুষের মধ্যে এমন কৌতূহল সৃষ্টি করার জন্য। জনজীবনে সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অনস্বীকার্য।

রামধনু -
Tushar Gorai
Jan. 11, 2025 | বিজ্ঞানমনস্কতা | views:415 | likes:7 | share: 2 | comments:0

পৃথিবীর বহু অলৌকিক ঘটনা আমাদের নজরের আড়ালেই রয়ে যায় হয়তো আমরা সেগুলি ঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারিনি। এইসব জাগতিক ঘটনা আমাদের মনে এতটা নাড়া দেই না বা আমরা এইসব ঘটনাগুলি উপভোগ করতে পারিনি। পৃথিবীতে আলোর অবিশ্বাস্যকর কান্ডকারখানার উদাহরণ প্রচুর রয়েছে।আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে রামধনু এমন একটি ঘটনা।

রামধনুর বিজ্ঞান এতটাও জটিল নয় একটু বিশ্লেষণ করলেই জলবৎ তরলং। পুরাণে রামধনুকে ভগবানের ধনুক হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে যা কিনা মর্ত্য ও স্বর্গের মধ্যে যোগাযোগের পথ। অতীতে অনেক বিদগ্ধ পন্ডিতগণ এই বিষয়ে বিভিন্ন মতামত রেখে গেছেন।নিউটন প্রথম দেখালেন সাধারন সূর্যালককে কাঁচের প্রিজমের মাধ্যমে বিচ্ছুরিত করে 7 টি রঙে ভাঙ্গা যায়।সেই বিচ্ছুরিত আলোককে পুনরায় সাধারণ আলোতে ফিরিয়ে আনেন। এইসমস্ত পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে আলোক সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্তে আসেন।

আকাশের লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র জলকণার মধ্যে মেঘ - বাদলের বাধা ছাড়া পৌঁছতে পারলেই অনেকখানি কাজ হয়ে যায়।সূর্যালোক জলকনার মধ্যে প্রবেশ করে 7 টি রঙে ভেঙে যায়। যেখানে লাল  রঙের রশ্মি বিচ্ছুরিত হয় সবচেয়ে কম আর বেগুনি রঙের রশ্মি বিচ্ছুরিত হয় সবচেয়ে বেশি। এই পদ্ধতিতে লক্ষ লক্ষ জলকণার মধ্যে বিচ্ছুরিত হয় সূর্যালোক ভিন্ন ভিন্ন কোন দৃষ্টি করে। এই কোন ০ থাকে ৪২ ডিগ্রি পর্যন্ত যেকোনো হতে পারে তবে ৪২ এর থেকে কখনও বেশি হয় না। প্রতিটি রঙের রশ্মির জন্য নির্দিষ্ট বিচ্ছুরণ কোন থাকে যেমন বেগুনি রঙের রশ্মির জন্য সর্বোচ্চ কোন ৪০ ডিগ্রি।

রামধনুকে দেখার জন্য বেশ মজার কায়দা আছে। বৃষ্টিস্নাত পরিষ্কার আকাশে সূর্য যেদিকে আছে ঠিক তার উল্টো দিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়াতে হবে প্রথমে। সূর্য থেকে আগত রশ্মিগুলিকে একটি নির্দিষ্ট লাইন ভেবে আমার মাথার ঠিক উপর দিয়ে ছায়ার শেষ পর্যন্ত কাল্পনিক রেখা ধরলাম। এই কাল্পনিক রেখা যেন জলবিন্দু গুলি থেকে আগত রশ্মি গুলির সাথে সমান্তরাল হয়। এ কাল্পনিক রেখা কিন্তু রামধনুকে দেখার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই কাল্পনিক রেখার সঙ্গে ৪২ ডিগ্রি কোনের থেকে একটু বেশি  কোনে উপরের দিকে তাকিয়ে দেখলে হয়তো আমরা রামধনুকে দেখতে পারব। যেখানে ৪০ ডিগ্রি থেকে একটু বেশি কোণে তাকিয়ে দেখলে আমরা বেগুনি রঙের প্রাধান্য দেখতে পাব যদিও বেগুনি রং রংধনুতে খুবই ম্লান ।


এখন তাহলে মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এই রংধনুটা বাঁকানো কেন হল? তার কারণ হলো ৪২ ডিগ্রির বেশি কোণে সমস্ত দিক থেকে বিভিন্ন রঙের বৃত্তাকার পরিধি আমরা দেখতে পাই। সমস্ত রংধনুই যে পূর্ণ বৃত্তাকার পরিধি গঠন করে তা নয়। অপর্যাপ্ত পরিমাণে জলবিন্দু এবং মেঘ-বাদলের বাধা তার কারণ।

তথ্যসূত্র: For The Love Of Physics - Walter Lewin

Rainbow



আমাদের কথা


এই দুর্নিবার সময়েও লেখনী চালিয়ে যাওয়ার মত ধীশক্তি ধরে রেখে মুক্তচিন্তকরা নিরন্তর লিখে চলেছেন। তাঁদের লেখাগুলি সংকলিত করে প্রকাশিত হয়ে চলেছে চেতনার অন্বেষণে পত্রিকা। যা দুই বাংলার পাঠকদের কাছে দ্রুত সমাদৃত হয়। এই পথ চলার একটি ধাপে এসে অন্বেষণ পাবলিশার্স পথ চলা শুরু করেছে মূলত মুক্তচিন্তা ও বিজ্ঞানমনস্ক বইগুলিকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে। আমাদের কথা বলতে লেখক, পাঠক সবাই মিলিয়েই আমরা।

ওয়েবসাইট প্রসঙ্গে


এটি মূলত বিজ্ঞানমনস্কতা, যুক্তিবাদ চর্চা এবং বইপত্রের প্ল্যাটফর্ম। এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যুক্তিবাদীদের লেখার চর্চাকে অনুপ্ররণা যোগাবে। লগইন করে আপনিও লিখতে পারবেন, ওয়েবসাইটটি সমস্ত বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিবাদীদের উদ্দেশ্যে নির্মিত।

যোগাযোগ


Email: yuktibadira@gmail.com

WhatsApp: +91-9433794-113


Website visit count:
96049